নিউজ পোল ব্যুরো: দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের গ্বদর শহরে অবস্থিত ঝাঁ-চকচকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Gwadar International Airport)। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও বিলাসবহুল লাউঞ্জ, বিশাল পার্কিং লট, তাক লাগানো ফুড কোর্ট এবং রেস্ট রুম—সবই আছে। কিন্তু নেই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস—যাত্রী ও বিমান চলাচল।২০২৩ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে এই বিমানবন্দরের উদ্বোধন করেছিল। চীনের (China) সম্পূর্ণ অর্থায়নে তৈরি এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ২৪ কোটি ডলার (USD 240 million)। তবে উদ্বোধনের পরেও(Gwadar International Airport) বিমান ওঠানামা করছে না, কারণ বিমানবন্দরের চার লক্ষ যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্বদরে যাত্রীসংখ্যা অত্যন্ত কম।
গ্বদর শহরে (Gwadar) প্রচুর পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বিশুদ্ধ পানীয় জল ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এখানকার প্রধান সমস্যা। বিমানবন্দরের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় ইরানের (Iran) পাওয়ার গ্রিড অথবা সৌর প্যানেলের (Solar Panel) মাধ্যমে। বালুচিস্তান (Balochistan) প্রদেশ পাকিস্তানের অন্যতম পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তেমন হয়নি। আনুমানিক ৯০ হাজার জনসংখ্যার এই শহরে খুব কম মানুষেরই বিমানে ভ্রমণের আর্থিক সামর্থ্য আছে। এছাড়া, বালুচিস্তানে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর (Militant Groups) সক্রিয়তা এবং প্রায়ই সেখানে পাক সেনাকে (Pakistani Army) লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিদেশিরাও গ্বদরে আসতে চাইছেন না, যা বিমানবন্দরের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তান সরকার শুরুতে এই প্রকল্পকে তাদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল এবং চীনের “উপহার” হিসেবে প্রচার করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বেইজিং (Beijing) জানিয়ে দেয়, গ্বদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্পটি সম্পূর্ণরূপে ঋণের (Loan) মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, এটি কোনো উপহার নয়। এর ফলে পাকিস্তান জুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আজিম খালিদ (Azeem Khalid) এই প্রসঙ্গে জানান, “বিমানবন্দরের মালিকানা(Gwadar International Airport) চীনের হাতে। এর সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। চীন তাদের নিজস্ব নাগরিকদের জন্যই গ্বদরে এই বিমানবন্দর নির্মাণ করেছে।”

২০১৩ সালে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর’ (CPEC) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শুরুতে এই প্রকল্পে ৪,৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হলেও পরবর্তীতে তা বেড়ে ৫,০০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এই প্রকল্পের আওতায় পশ্চিম চীনের শিনজিয়াং (Xinjiang) প্রদেশের কাশগড় (Kashgar) থেকে শুরু হয়ে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের (Pakistan-Occupied Kashmir) কারাকোরাম (Karakoram) পর্বতমালা পেরিয়ে ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা গ্বদর সমুদ্র বন্দরে গিয়ে শেষ হবে। চীনের “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (Belt and Road Initiative বা BRI)-এর অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে এই করিডরকে বিবেচনা করা হয়। তবে গ্বদর বিমানবন্দর এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গ্বদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। যাত্রী না থাকায় এটিকে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠেছে। চীনের স্বার্থের জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তবে সময়ের সাথে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে হয়তো একদিন এই বিমানবন্দর কার্যকর হবে। এখন শুধু সময়ই বলবে, এই প্রকল্প পাকিস্তানের জন্য লাভজনক হবে, নাকি চীনের জন্য আরেকটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবেই থেকে যাবে।