বিশ্বদীপ ব্যানার্জি: “আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল/ পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল রে হরিবোল!” কি, ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল তো? পড়তেই হবে! বিশেষ করে, আপনার জন্ম যদি ৯০ দশক কিংবা তারও আগের সময়ে হয়ে থাকে তাহলে তো মনে পড়তে বাধ্য। ওই সময় বেড়ে উঠেছে অথচ দোলের (Holi) ঠিক আগের রাতে এই ন্যাড়াপোড়ার সাক্ষী থাকেনি, এমন বঙ্গসন্তানের পাত্তা সম্ভবত মাইক্রোস্কোপও লাগাতে পারবে না। সম্ভবই না সেটা।
আরও পড়ুনঃ Holi 2025: রঙের উৎসবের নেপথ্যে সাদা পোশাক
কিন্তু জানেন কি এই দোল পূর্ণিমার (Holi) আগের রাতে ন্যাড়াপোড়া ব্যাপারটি আসলে ঠিক কী? কেন এমন অদ্ভুত নাম হয়েছে? আসুন, একটু অনুসন্ধান করা যাক। তখন সত্যযুগ। দুর্দমনীয় রাক্ষসরাজ হিরণ্যকশিপুর অত্যাচারে অতিষ্ট গোটা ত্রিলোক। কেউ তার ভয়ে টুঁ শব্দটি ও করতে সাহস পায় না। ব্যাতিক্রম একমাত্র স্বপুত্র প্রহ্লাদ। সে আবার বিষ্ণুর এতই ভক্ত যে বাপকে কোনো তোয়াক্কাই করে না। রাতদিন শুধু হরি আর হরি।
এদিকে হরি তো আবার ইতিমধ্যেই হিরণ্যকশিপুর দাদা হিরণ্যক্ষকে বরাহ অবতারে হত্যা করে বসে আছেন। কাজেই, দৈত্যদের প্রধান চক্ষুশূল। আর একমাত্র পুত্র প্রহ্লাদ শেষে কি না তাঁরই ভজনায় ব্রতী হল! ক্রুদ্ধ রাক্ষসরাজ বাধ্য হয়েই ছেলেকে সহবত শেখানোর নানারকম চেষ্টা করতে লাগলেন।

কিন্তু হায়! কিছুতেই কিছু হল না। হিরণ্যকশিপু যে মতলবই ভাঁজেন, বিষ্ণুমায়া প্রয়োগ করে হরি তাই বানচাল করে দেন। অগত্যা হিরণ্যকশিপুকে আঙুল বাঁকাতেই হল। তিনি নিজের ছেলেকেই হত্যা করার নির্দেশ দিলেন বোন হোলিকাকে। এই হোলিকার আবার একটি বিশেষ ধরণের চাদর ছিল, যা তাকে পিতামহ ব্রহ্মা বরস্বরূপ দিয়েছিলেন। এই চাদরটি গায়ে থাকাকালীন বাহ্যিক কোনো বস্তুই তাকে স্পর্শ করতে পারত না। সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা হল,
এই চাদর গায়ে দিয়ে হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ভেতরে বসবে। এর ফলে হোলিকার কোনো ক্ষতি হবে না কিন্তু প্রহ্লাদ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। ফাল্গুনী পূর্ণিমার ঠিক আগের রাতে চাদর পরিহিতা হোলিকা ভাইপো প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করে। কিন্তু কথায় বলে, “রাখে হরি মারে কে” আর “মারে হরি রাখে কে?” প্রিয় ভক্তের ডাকে ব্যাকুল বিষ্ণু এমনই ভেলকি দেখালেন যে, ব্রহ্মার চাদর হোলিকাকে অনাবৃত করে প্রহ্লাদের গায়ে এসে জড়াল। আর তারপর?
নিউজ পোল ফেসবুক পেজের লিংক: https://www.facebook.com/share/1EA79Afcw5/
তারও পর? লক্ষ লক্ষ প্রজ্বলন্ত অগ্নিশলাকার মাঝে অরক্ষিতা হোলিকা! সম্পূর্ণরূপে ছাই হয়ে যেতে কতক্ষণ লেগেছিল তা অবশ্য বলা মুশকিল। ওদিকে প্রহ্লাদ তো মনের সুখে হরির নাম জপেই চলেছে। হৃষিকেশের কৃপায় আর ব্রহ্মার গুণে সে ভীষণ তাপও যে তখন তার নিকট বেশ বাতানুকুল, তা তো বলাই বাহুল্য।
ফাল্গুনী শুক্লপক্ষের চতুর্দশতম দিন প্রাক দোলযাত্রা (Pre Holi)। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এই বিশেষ দিনেই ভগবান বিষ্ণু হোলিকা দহনের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়েছিলেন বলে আজও দিনটিতে ভারতবর্ষের নানা স্থানে রাক্ষসী হোলিকা তথা অশুভ শক্তির রূপক হিসেবে পুরানো ডালপালা, আগাছা ইত্যাদি পুড়িয়ে ন্যাড়াপোড়া উৎসব পালন করা হয়। যদিও বর্তমানের কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়েই যেতে বসেছে এই উৎসব।