April Fool: বোকা হ‌ওয়ার আবার দিন হয় নাকি? বলছে সুকুমার রায়ের সেই ‘বেড়াল’

অফবিট

শুভম দে: ছিল রুমাল। হয়ে গেল বেড়াল। অমনি বেড়ালটা বলে উঠল, “মুশকিল অবার কি? ছিল একটা ডিম, হয়ে গেল দিব্যি একটা প্যাঁক্‌পেঁকে হাঁস। এ তো হামেশাই হচ্ছে।” — সুকুমার রায়ের মত ভবিষ্যত দ্রষ্টা বোধহয় খুব কম‌ই জন্মেছেন এই পৃথিবীতে। তা হঠাৎ এই মঙ্গলের দুপুরে সুকুমার বাবুকে কেন টেনে আনলাম? কারণ আছে মশাই। আজকের তারিখটা খেয়াল আছে তো? ক্যালেন্ডারে দেখুন। উঁহু সরি সরি! হাতের মুঠোতেই তো এখন ক্যালেন্ডার। কি দেখাচ্ছে যন্ত্রটার স্ক্রিন? জ্বলজ্বল করছে তো তারিখটা? পয়লা এপ্রিল। দিনটার পোশাকি নাম ‘এপ্রিল ফুল।“ (April Fool) অর্থাৎ বোকা বানানোর এবং বোকা বনার দিন। কিন্তু এ আর এমন কি! ওই যে শুরুতেই সুকুমার রায়কে টেনে আনলাম। বেড়ালটাতো সেই কবেই বলে গিয়েছে “এ তো হামেশাই হচ্ছে!”

আরও পড়ুন: Ghibli Image: কী ভাবে তৈরি করবেন আপনি ! রইল পুরো পদ্ধতি

তা ঠিক‌ই তো। হামেশাই হচ্ছে। ‘ফুল’ হবার আবার কোন নির্দিষ্ট দিন আছে নাকি? ভোট আসলে ‘ফুল’, ভোট মিটলে ‘ফুল’, প্রেমিক যুগল একে অপরকে ‘ফুল’ — ‘ফুল’ -এর ঠেলায় চোখে সর্ষেফুল! ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৫৮২ সালে ফ্রান্সে জুলিয়াস সিজার প্রবর্তিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে চালু হয় গ্রেগরিয়ান বা জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার। এর আগে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১ এপ্রিল বছরের প্রথম দিন হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন নির্ধারিত হয় ১ জানুয়ারি। কিন্তু তখন তো আর এই ‘সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড’ -এর যুগ ছিল না যে আমেরিকায় কিছু হলে তার মুহূর্তে পৌঁছে যাবে ভারতে! তাই এই পরিবর্তন সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায় ফ্রান্সবাসী এবং পয়লা এপ্রিলেই নববর্ষ উদযাপন চালিয়ে যান। ফলে তাদের নিয়ে ঠাট্টা করা শুরু করেন জর্জিয়ানরা যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় হাসি-ঠাট্টা-মজার ‘এপ্রিল ফুল’ (April Fool)-এ। যা হয়ে এসেছে আরকি চিরকাল মানুষের ‘অজ্ঞতা’ নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি!

তবে যা হয় ‘যত মত তত পথ!’ ‘মত’ তো আর একটা না। তাই আরেকটি তত্ত্ব বলে, মধ্যযুগে ইউরোপে “ফিস্ট অফ ফুলস” নামে একটি উৎসব পালিত হতো, যেখানে লোকেরা একে অপরকে হাসি-ঠাট্টা করে বোকা বানাতো। সেই রসিকতাপূর্ণ পরিবেশ থেকেই এপ্রিল ফুলের (April Fool) ধারণা জন্ম নিয়েছে বলে মনে করা হয়। আবার কথিত আছে যে ১৩৮১ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড এবং বোহেমিয়ার রানি অ্যানের বাগদানের তারিখ রাখা হয়েছিল ৩২ মার্চ। উৎসবে মেতে ওঠেন সাধারণ মানুষ কিন্তু পরে তারা বুঝতে পারেন যে ক্যালেন্ডারে ৩২ মার্চ বলে কোনও তারিখ‌ই নেই, বোকা বানানো হয়েছে তাদের।

আরও ঘটনা শোনা যায় এই দিনটিকে (April Fool) ঘিরে। মার্চের শেষ দিকে রোমে ‘হিলারিয়া’ নামে একধরণের মজার উৎসব পালন করা হতো। যেখানে মানুষ বিভিন্ন ছদ্মবেশ নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ঠাট্টা করতেন। আবার আরও একটি গালগল্প প্রচলিত রয়েছে যে কুগেল নামে একজন ভাঁড়কে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন একদিনের জন্য রাজা হতে দিয়েছিলেন এবং দিনটিকে মজার দিন হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। যদিও এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ৮০ ‘র দশকে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ জোসেফ বসকিনের একটি প্রচলিত গল্পে।

আবার এই দিনটিকে ঘিরে রাজার হাত থেকে নিজ সম্পত্তি, ঘর-বাড়ি রক্ষা করার মত বিষয়‌ও রয়েছে। অর্থাৎ দিনটিকে ছুঁয়ে আছে রাজার বিরুদ্ধে প্রজাদের বিপ্লব‌ও। ব্রিটেনের নটিংহ্যামশায়ারের একটি ছোট শহর ছিল ‘গথাম’ নামে, যা বোকাদের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। কিংবদন্তি অনুযায়ী, ত্রয়োদশ শতকে ইংল্যান্ডের রাজা জন একটি অদ্ভুত নিয়ম প্রবর্তন করেন যে তিনি যেখানে পদার্পণ করবেন, সেই স্থান রাষ্ট্রের সম্পত্তি হয়ে যাবে। এই নিয়ম শুনে গথামবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। রাজার আগমনে নিজস্ব জমি হারানোর ভয় গ্রাস করে তাদের।

কিন্তু গথামের বাসিন্দারা ছিলেন চতুর। রাজাকে প্রতিরোধ করার জন্য তারা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করল। তারা জানত, রাজার সৈন্যদের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জয় লাভ অসম্ভব। তাই রাজসৈন্য গথামে পা রাখতেই শহরের মানুষ পাগলামির ভান করা শুরু করে। কেউ মাছকে জলে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করল, কেউ আবার ছায়ার সাথে যুদ্ধ করল। পুরো শহর যেন পাগলামিতে মত্ত! জনের সৈন্যরা এই উদ্ভট কাণ্ড দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো। তারা ভাবলো, এই শহরের মানুষ বোধহয় সত্যিই পাগল। সৈন্যরা সব দেখে শুনে রাজাকে জানালো, হুজুর শহরটা পাগলে ভরা। রাজা জনও সিদ্ধান্ত নিলেন, এই পাগল শহর তার কোনো কাজের নয়। তিনি গথামকে তার রাষ্ট্রের বাইরে রাখলেন। এইভাবেই রাজাকে বোকা বানিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করেছিল গথামের মানুষ। পরবর্তীতে পশ্চিমি সংস্কৃতিতে গথাম শহরের এই বোকামি ও রাজাকে ধোঁকা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এপ্রিল ফুল (April Fool) দিবস উদযাপন শুরু হয়।

নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব চ্যানেল লিংক: https://youtube.com/@newspolebangla?si=mYrQvXTBQ1lG3NFT

আসুন ফেরা যাক বর্তমানে। এ তো গেলো ইতিহাসের কথা। আজকের দিনেও এদেশে ‘এপ্রিল ফুল’ (April Fool) হতে থাকে মানুষ প্রতি পদে পদে। আসলে শুধু এদেশে নয়। সারা বিশ্বজুড়েই শাসক বোকা বানাতে থাকে মানুষকে। তবেই না শাসকের শাসন বজায় থাকে! মজা আজ আর নিছক হাসি-ঠাট্টাই সীমিত নেই। যৌনতা থেকে রাজনীতি-ধর্ম সব‌ই আজ হাস্যরসের বিষয়। জোর করে সুরসুরি দিয়ে হাসানোর চেষ্টা আরকি! তবে মানুষের মুখ থেকে ‘হাসি’ নামক বস্তুটি নিঁখোজ হয়ে গিয়েছে আজ বহুদিন হলো। সমাজের এক শ্রেণী সপ্তাহান্তে পানীয়র গ্লাস হাতে মেতে ওঠেন পানশালায়। ওঠে হাসির রোল। আর বাইরে স্ট্রিয়ারিং হাতে বসে অপেক্ষা করতে করতে মাস শেষে সংসার খরচের টাকার চিন্তা করতে থাকে উদাসী কোন এক যুবক। ঘরে তার অপেক্ষায় ভাতের থালা নিয়ে বসে থাকেন কোন এক মা বা কোন এক তরুণী। দিন যায়, মাস যায়, যায় বছর। ‘আচ্ছে দিন’ বা ‘অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ’ বা ‘ভুরি ভুরি নিয়োগ’ -এর মত ‘এপ্রিল’ ‘মে’ বা ‘জুন’ ফুলের ‘হাস্যরসে’ বোকা বনতে থাকে মানুষ। তবু ভোট আসলেই ‘সকাল সকাল ভোট দিন’ -এর সুরে বেড়ালটা‌ও যেন বলে ওঠে “এ তো হামেশাই হচ্ছে!”