On This Day : ঘরের মাঠে বিশ্বজয়! ফিরে দেখা ২০১১

ক্রিকেট ক্রীড়া

বিশ্বদীপ ব্যানার্জি : “রোজ কত কী ঘটে যাহা-তাহা…” হ্যাঁ, ঠিকই তো। ঘটে বলেই না এই On This Day নামক সেগমেন্টে স্মৃতি রোমন্থনের সুযোগ মেলে! তবে স্মৃতি যে সততই সুখের নয় তা কে না জানে? তাই সত্যিকারের সুখস্মৃতি রোমন্থন করার মওকা যখন মেলে তার মাধুর্য্যে ফিকে হয়ে যায় বর্তমানের ব্যর্থতাও। তখন মনের কোণে রাজত্ব চলে এক এবং অদ্বিতীয় রবি ঠাকুরের। “পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়। ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়?”

আরও পড়ুনঃ On This Day: ২৩ মার্চ এবং একটি অভিশাপ

১৪ বছর আগে আজকের দিনটিতে (On This Day) ভারতীয় ক্রিকেট তার দ্বিতীয় সবথেকে বড় সাফল্যকে ছুঁয়ে দেখেছিল। যে সাফল্য শুধু নীল জার্সিধারী সেনাদলের জন্য নয়, সমানভাবে জরুরী ছিল তাঁদের সমর্থকদের জন্যও। “তোরা আর কী খেলা দেখিস! ‘৮৩ বিশ্বজয় দেখেছিস?” ৯০ দশকের ছেলেমেয়েদের কতবার যে এই প্রশ্নের সন্মুখীন হতে হয়েছে, তার ইয়াত্তা নেই। স্বাভাবিকভাবেই তো তাদের বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ার কথা দলটার প্রতি। একটা বিশ্বকাপ জিততে পারে না, এরা আবার কী ক্রিকেট খেলে!

নাঃ কাঁচা বয়সের অপরিণত মস্তিষ্কপ্রসূত অপরিপক্ক ভাবনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ যুগের ক্রিকেট অনুরাগীদের মধ্যে অনেকেরই হাতে— থুরি চোখে খড়ি ২০০৩ বিশ্বকাপে। হতাশার ট্রাডিশনও সেই শুরু। অবশ্য লি-ম্যাকগ্রা সমন্বিত পেস ব্যাটারির সামনে ৩৬০ ছুঁতে ছুঁতে যে হিলারি-নোরগেদের আরও একবার এভারেস্ট জয় হয়ে যাবে, এই অঙ্ক বোধগম্য হওয়ার লগ্ন তখনও আসেনি। পরের ৪ বছরে আবার বয়স এবং অভিজ্ঞতা, দুইই বেড়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের প্রাঙ্গণে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বাপেক্ষা রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টি যে সেবারই লেখা হবে, তার আগাম পূর্বাভাস মিলেছিল কই?

On This Day

অবশ্য অজিদের চতুর্থ বিশ্বজয়ের বছর যে পুরোপুরিই চোখের জলে ভাসিয়েছে, তাই বা কেমন করে বলা চলে? প্রখর দাবদাহের মাঝে টি-টোয়েন্টিরূপী একমুঠো শীতল মলয়, সে তো দিয়েছিল এই ২০০৭ -ই। তবু ওডিআই বিশ্বকাপ হল ওডিআই বিশ্বকাপ! দুধের পুরোপুরি স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে?

অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান। মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে দশম আইসিসি বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ফাইনালে মুখোমুখি ভারত-শ্রীলঙ্কা। ২০১১ সালের আজকের দিনে (On This Day)।

গোটা টুর্নামেন্টে, বিশেষ করে নক আউট পর্যায়ে যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে রিংটোনটা ধোনি এন্ড কোং সেট করেছিল তাতে বয়স্ক ব্যক্তিমাত্রেরই ৮৩ র রিপিট টেলিকাস্ট ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছিল না। অন্যদিকে কচিকাঁচারা, অন্তত একবারের জন্য হলেও, অধরা মাধুরীটিকে তখন প্রাণভরে আলিঙ্গন করার রঙীন নেশায় বুদ। আর স্বয়ং ক্রিকেট ঈশ্বর? তিনি কি একবারের তরেও ভেবেছিলেন নিজের প্রিয়তম উপাসককে বিশ্বমঞ্চ থেকে চিরকালের মতো খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা?

প্রবাদ অনুযায়ী, শুরুটাই নাকি বলে দেয় গোটা দিন কেমন কাটবে। প্রথম হোঁচটখানা সেখানেই। ম্যাচ রেফারি এবং দর্শকদের সৌজন্যে টস বিভ্রাটের সুযোগ নিয়ে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত কুমার সাঙ্গাকারার। আসলে, টসটা প্রথমে ধোনিই জিতেছিলেন; কিন্তু ঘরের ছেলের মস্তকে প্রথমবার বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ তাজখানা উঠতে দেখার স্বপ্নে বিভোর মুম্বইকরদের হর্ষোল্লাসের ঠ্যালায় সফরকারী অধিনায়কের কলটা শুনতেই পাননি ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো। অগত্যা মুদ্রা পুনরায় শূন্যে ভাসমান। এবং লঙ্কার বাজিমাত।

কাশ্মীর টু কন্যাকুমারীর অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণের সেই সূত্রপাত। এরপর যত সময় পেরিয়েছে, পারদ চড়তে-নামতে কখন যে মাহেলা জয়াবর্ধনের অপরাজিত ১০৩ দ্বীপরাষ্ট্রকে ২৭৪/৬ র সুরক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, তা টেরই পায়নি আসমুদ্র হিমাচল।

যাক্ তবু বাঁচোয়া। ৫০ ওভারে ৫.৫ -এর আস্কিং রেট ওয়াংখেড়ের মতো ছোট মাঠে আদতে ৪.৫ -এর বেশি শুধু ২০১১ বলে নয়, কোনওকালেই ছিলনা। তাই? ম্যাচের স্ট্যাটাসটা মনে আছে তো? সাধারণ ম্যাচের ৫.৫ এখানে কিন্তু ৭.৫ -এরই সমতুল্য। ও হ্যাঁ, মাঠটায় নাকি ২২৯ -এর বেশি চেজও হয়নি এর আগে। আর কিছু জানা বা বোঝার আগেই ভারতবাসী দেখল, কোনও এক ঝাঁকড়া চুলের মালিঙ্গা সেহবাগের পর পরই ঘরের ছেলেটাকেও ফিরিয়ে দিয়ে ১২৫ কোটির ২৮ বছরের স্বপ্নটাকে হত্যা করছে তিলে তিলে। স্কোরবোর্ডে “ইন্ডিয়া” শব্দটির পাশে ৩১/২ লেখা।

আচ্ছা, তখন কি ভারতবাসীর একটিবারের জন্য হলেও বিশ্বাস উঠে যায়নি দলটার ওপর থেকে? একবারও কি এটা মনে হয়নি যে এতগুলো মানুষের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার এদের কে দিয়েছে? কে জানত, একজনের জার্সিতে লেগে থাকা ধুলো এবং আরেকজনের ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে তুলে আনার মতো যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত আগামী ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে তছনছ করে দিতে চলেছিল বিশেষজ্ঞদের যাবতীয় সমীকরণ। গৌতম গম্ভীর ১২২ বলে ৯৭ এবং মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ৭৯ বলে ৯১ অপরাজিত। বিরাট কোহলির মত সেট হয়ে যাওয়া তরুণ তুর্কিকে অসাধারণ ফিরতি ক্যাচে দিলশান ফেরানোর পর যাঁরা লঙ্কাবাসীদের একবারের জন্যও বুঝতে দেননি যে কাপটা তাঁদের।

“স্বপন যদি মধুর এমন…” আসলে আজ ১৪ বছর পরেও গোটাটাই একটা স্বপ্ন! ৪৯ তম ওভারের দ্বিতীয় বলে নুয়ান কুলশেখরা তথা সমগ্র শ্রীলঙ্কার উদ্দেশ্যে শেষ মিসাইলটা দেখে আশ্চর্যরকমের নিস্পৃহ হয়ে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন কুল। গোটা ভারতের চোখে তখন জল। সেই অবস্থাতেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে চেয়ে গোটা দেশ দেখেছিল তাদেরই মত আনন্দাশ্রুতে ভাসা ঘরের ছেলেটাকে কাঁধে চাপিয়ে গোটা ওয়াংখেড়ে প্রদক্ষিণ করছেন কোহলি, ইউসুফ, মুনাফরা। যতই মাত্র ১৪ টি ডেলিভারির সন্মুখীন হয়ে ১৮ রান করে বিদায় নিন না কেন, কাপজয়ের সকল অনুপ্রেরণার উৎস তো তিনিই। সচিন রমেশ তেন্ডুলকর। ক্যান্সার আক্রান্ত যুবরাজ সিংহ তো কেবলমাত্র তাঁর জন্যই নিজের সমস্তটা উজাড় করে দিতে চান।

অথচ ১৪ বছর পর সমস্ত সত্যিটা যখন সামনে এসে গিয়েছে তখন এই On This Day তে স্মৃতি রোমন্থন করতে বসে সত্যিই কেমন আশ্চর্য লাগে। মনে হয়, সমস্ত মালমশলা মজুদ ছিল সেটা ঠিক তবু শেষপর্যন্ত কীভাবে কাপ জিতল এরা? প্রথমতঃ দলের অন্দরে তখন বেশ টালমাটাল অবস্থা। ধোনি ঘোষিত অধিনায়ক কিন্তু তা সত্ত্বেও রায়না আর অশ্বিন বাদে বাকি সকলের জন্যই অঘোষিত অধিনায়ক ছিলেন সচিন। এমনকি যুবরাজ-গম্ভীররা ধোনির থেকে বিদেশি কোচ কার্স্টেনকে বেশি বিশ্বাস করতেন। দ্বিতীয়তঃ যুবরাজ সিংয়ের দুরন্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সেই ২৮ বছর পর কাপ ঘরে তোলে টিম ইন্ডিয়া। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে যুবিকেও খুব বেশি ম্যাচ খেলতে দেখা যায়নি। কারণটা ক্যান্সার নয়। বরং চোট এবং খারাপ ফর্ম। ২০১০ -এর অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দলে কামব্যাক করেন যুবি। সেই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এর পরের সিরিজে দুটো ৪০+ ছাড়া বিশ্বকাপের আগে সে অর্থে আর কোনও বড় পারফরম্যান্স ছিল না।

শুধু কি তাই? ভারতের মিডল অর্ডার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ভয়াবহ রকমের কোল্যাপস করেছিল। বিশেষ করে ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে। টুর্নামেন্টে সবথেকে খারাপ ব্যাটিং পাওয়ার প্লে রেকর্ড মেন ইন ব্লুর’ই ছিল। বিষয়টা ছিল এমন, সচিন-সহবাগ-গম্ভীররা ভাল শুরু করবেন। কিন্তু শেষদিকে ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে পরপর উইকেট পড়ে আটকে যাবে দল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ২৬২/১ থেকে ২৯৬ তে আটকে যায় ভারত। এর আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও গল্পটা একইরকম। কিন্তু নক আউটে সেই মিডল অর্ডারই ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব চ্যানেলের লিংক: https://youtube.com/@newspolebangla?si=Ygy6shQubNhWstbr

হ্যাঁ, তবু কাপ এসেছিল। আর এসেছিল দলের প্রতিটি সদস্যের জন্যই। মারণরোগে আক্রান্ত হয়েও ৩৬২ রান এবং ১৫ টি উইকেট। যুবরাজ সিং দেশকে চ্যাম্পিয়ন করার মাধ্যমে দিয়ে যান জীবনের সবচেয়ে বড়ো নীতিশিক্ষাটি— হাল ছেড়ো না, বন্ধু? যেখানে তাঁর অধিনায়ক শেখান গীতার সেই স্থিতধী পুরুষ হতে। বিশ্বকাপ জিতেও নিজের সমস্ত আবেগকে অনায়াসে উপেক্ষা করতে আর কোন অধিনায়ক পেরেছেন? আর গৌতম গম্ভীরের ধূলিমলিন শার্ট বলে যায় একটাই কথা। যাই ঘটে যাক, The Show must go on!

এ সমস্ত কিছু ঘটেছিল বলেই না আজ On This Day তেও স্মৃতি রোমন্থনের সুযোগ মিলছে।