নিউজ পোল ব্যুরো: তিনি ফিরতেই যেন লকগেট খুলে গেল গোলের। ৪৮৯ দিন পর জয়ের স্বাদ পেল ভারতীয় ফুটবল (Indian Football)। ভারতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম জয় পেলেন কোচ মানোলো মার্কেজ (Manolo Marquez)। আজও সেই তিনিই ভরসা। তিনিই ত্রাতা। তিনি মাঠে নামলে যেন প্রাণ পায় ক্রিকেট সর্বস্ব এই দেশের ফুটবল। নতুন করে আর বলতে হবে না তিনি সুনীল। সুনীল ছেত্রী (Sunil Chhetri)— দ্য লিডার দ্য ক্যাপ্টেন দ্য লিজেন্ড। ন’মাস পর অবসর ভেঙে তাঁকে ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন জাতীয় দলের কোচ। তিনি কথা রেখেছিলেন। আর বুধবার প্রত্যাবর্তনেই গোল করে বুঝিয়ে দিলেন ফুটবলটা এখনও ফুরিয়ে যায়নি তাঁর মধ্যে থেকে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যেতে চান। তা প্রমাণও করলেন। মালদ্বীপের বিরুদ্ধে বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভারত জিতল ৩-০ গোলে (IND vs MDV)।
আরও পড়ুন: Sunil Chhetri: সুনীলের প্রত্যাবর্তন
শিলংয়ের জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে প্রথমবার কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজিত হল এদিন। শুরু থেকেই উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ পোস্টারে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার (Sunil Chhetri) ফিরে আসাকে স্মরণীয় করে রাখতে কোন কার্পণ্য করেনি নর্থ-ইস্ট। আর ছবির মত মাঠে শুরু থেকেই শিল্পীর তুলির ছোঁয়া ফুটিয়ে তুলেছিলেন লিস্টন-নাওরেম-ব্র্যান্ডনরা। যদিও মালদ্বীপের রক্ষণ ভাঙেনি।

যা ভাঙল ৩৫ মিনিটে। বাঁ দিক থেকে ব্র্যান্ডনের কর্নারে মাথা ছুঁইয়ে মালদ্বীপের গোলে বল জড়িয়ে দেন রাহুল ভেকে। মার্কেজ জমানায় গোলের ভাটায় এতদিন যে ৪টি গোল করেছিল ভারত তার মধ্যে দুখানা গোলই ভেকের। প্রথমা শেষে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ব্লু-টাইগার্স। এরপর যত সময় যায় লড়াই থেকে হারিয়ে যেতে থাকে ভারতের (১২৬) থেকে ৩৬ ধাপ নীচে থাকা মালদ্বীপ (১৬২)। দ্বিতীয়ার্ধে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন সুনীলরা (Sunil Chhetri)। আসলে শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক খেলছিল মালদ্বীপ। কিন্তু ভারতের মূহুর্মূহু আক্রমণের সামনে একসময় ভেঙে পড়ে তাদের ডিফেন্স।

দ্বিতীয়ার্ধে ধারাবাহিকভাবে গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন ফারুক চৌধুরী। বুধবার সুনীলকেও ছাপিয়ে যেতে পারতেন তিনি। হ্যাটট্রিকের খাওয়াতেও নাম লেখাতে পারতেন। কিন্তু ঠিকঠাক ফিনিশ না করতে পারার কারণ না সারালে সমস্যায় পড়তে হবে তাঁকে। এরপর ৬৫ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে লিস্টনের শট প্রতিহত করে মালদ্বীপ গোলরক্ষক। কিন্তু ঠিক তার পরমুহূর্তেই ৬৬ মিনিটে মহেশ সিংয়ের কর্নার থেকে হেড করে তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটি করে যান লিস্টন।

অবশেষে এল সেই মুহূর্ত। যার জন্য ২-০ গোলে ভারত এগিয়ে যাওয়ার পরেও চাতকের মত অপেক্ষা করেছিল গোটা দেশ। ম্যাচের বয়স তখন ৭৭ মিনিট। লিস্টনের ক্রস ভেসে এল এগারো নম্বর জার্সিধারী দিকে। মাথা ছোঁয়াতে ভুল হল না ভারতীয় ফুটবলের পোস্টার বয়ের। সারা দেশ যেন থমকে গেল। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতূ থেমে গেল। মুহূর্তের জন্য। হ্যাঁ এই মুহূর্তগুলোই তো বেঁচে থাকা। ভাল থাকা। মালদ্বীপ গোলরক্ষক তখন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন বছর চল্লিশের বেঁটেখাটো এক চেহারা ছুটে চলেছে গ্যালারির দিকে। চোখের কোণা চিকচিক করছে তাঁর। ৮৩ মিনিটে তাঁকে তুলে নিলেন কোচ। শিলংয়ের শব্দব্রহ্ম তখন আকাশ ছাড়িয়েছে। এটাই সুনীল ছেত্রী (Sunil Chhetri)। যার নেই কোনো পিআর -এর চিন্তা, নেই লাইট-ক্যামেরার ঝলকানি, না কোনো বডিগার্ড, না কোনো আতিশয্যের ঘনঘটা। তিনি ভারতীয় ফুটবলের আকাশে ধ্রুবতারা। ক্রিড়াপ্রেমীরা বলেন, ক্যাপ্টেন, লিডার, লিজেন্ড। কিন্তু তিনি নির্দ্বিধায় কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্ত্রীর হাতে ফুচকা খান। জামাইষষ্ঠীতে পুরোদস্তুর বাঙালি সাজে আম-কাঁঠাল-দই ও খান আবার দেশের হয়ে ৯৫ খানা গোল করে রেকর্ডের পাতাতেও ঢুকে যান। কিন্তু এসব নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই। এই বুড়ো হাড়েও দেশের জন্য একটা গোল করতে পারলেই খুশি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য বড় স্ক্রিনে নাম ভেসে ওঠে। ঐ কয়েকটা সেকেন্ডই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, দেশের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছেন তিনি। আচ্ছা কতখানি প্রচারের আলো বিমুখ হলে এরকম কথা বলা যায় বলতে পারেন?
নিউজ পোল বাংলা ফেসবুক পেজের লিংক: https://www.facebook.com/share/1EA79Afcw5/
এতটুকু বাড়তি নেই কোথাও। নেই লোকদেখানো প্রচার। সবটুকু যেন আমার আপনার মতনই সাধারণ। আসলে সুনীলের (Sunil Chhetri) কাছে, “Life has been nothing short of a dream.” এই প্রচারসর্বস্ব দুনিয়াই এরকমই থাকুন ক্যাপ্টেন, মাটিতে পা রেখেও যে ওড়া যায় তা প্রমাণ করে দিয়েছেন আপনি। চলতি মাসের ২৫ তারিখ এএফসি এশিয়ান কাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলবে মার্কেজের ছেলেরা। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ খেলা শেফিল্ড ইউনাইটেডের হামজা চৌধুরী রয়েছেন বিপক্ষ দলে। সুনীল বনাম হামজা লড়াই দেখার জন্য মুখিয়ে আছে দুই দেশের ফুটবলপ্রেমীরা। যার আগে মালদ্বীপের বিরুদ্ধে চোট পেয়ে ছিটকে গেলেন ব্র্যান্ডন ফার্নান্দেজ। তবে সেসব নিয়ে যেন ভাবছেনই না ভক্তরা। কারণ ন’মাস আগে ভারতীয় ফুটবলাকাশে যে সূর্যাস্ত হয়েছিল, ১৯ মার্চ ২০২৫ -এ যে আবার সূর্যোদয় ঘটে গেছে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা সুনীলের প্রত্যাবর্তনে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত ৩
রাহুল ভেকে ৩৫’
লিস্টন কোলাসো ৬৬’
সুনীল ছেত্রী ৭৭’
মালদ্বীপ ০