Sabang Madur:“মাটির ঘর থেকে আন্তর্জাতিক গ্যালারিতে”— সবংয়ের মাদুর শিল্পে বাংলার মুখ উজ্জ্বল করলেন গৌরীবালা দাস!

রাজ্য

তারক হরি,পশ্চিম মেদিনীপুর:’সবং’ (Sabang Madur) নামটা শুনলেই মনে হতে পারে,একটা সাধারণ গ্রামীণ জনপদ। কিন্তু এই নিরীহ নামের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক অনবদ্য শিল্পবিপ্লবের গল্প, যা বাংলার মাটির গন্ধ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছে ইউরোপের গ্যালারিতে, আন্তর্জাতিক হস্তশিল্পের মঞ্চে।

আরও পড়ুন:https://thenewspole.com/2025/07/20/shashi-tharoor-nation-first-congress-divide-sindhura/

এই সবং (Sabang Madur) আসলে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এক কোণায় অবস্থিত, যার প্রতিটি পল্লি যেন একেকটা শিল্পের কারখানা। এখানকার মাদুর—শুধু পাটি নয়, এক জীবন্ত ইতিহাস, এক সাংস্কৃতিক পরিচয়, যা গড়ে উঠেছে গ্রামের মাটির ঘরে, উঠোনে, আর মায়েদের সৃষ্টিশীল হাতে।

সারতা, দাঁররা, বুড়াল কিংবা চাউলকুঁড়ি—এমন কত গ্রাম! এখানকার উঠোনগুলোয় সূর্যের আলোয় চকচক করে চটায়ের সুগন্ধে মেশা শিল্প। একসময় এসব হাতে বোনা মাদুর শুধু দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্যই তৈরি হত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে ধরণ, বদলেছে দৃষ্টি। আজ মাদুর মানেই শুধু ঘরের পাটি নয়—তা রঙে, নকশায়, ভাবনায় পেয়েছে নতুন পরিচয়। তৈরি হচ্ছে ব্যাগ, টুপি, পুতুল, আর সেই বিশেষ মুখ ফুটে ওঠা মাদুর, ‘মতরঞ্জি’ নামে যার খ্যাতি ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে।

এই শিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি গৌরীবালা দাস। সবংয়ের মাদুরকে নতুন পরিচয় দেওয়ার লড়াইয়ে যিনি একাই হয়ে উঠেছেন আলোকবর্তিকা। তাঁর হাতে তৈরি ‘মতরঞ্জি’ শুধু নিছক একখণ্ড শিল্প নয়—তা এক দৃষ্টিভঙ্গি, এক প্রতিবাদ, এক আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ। তাঁর সৃষ্ট ‘মতরঞ্জি’ পেয়েছে জাতীয় পুরস্কার, প্রশংসিত হয়েছে নানা মঞ্চে। তাঁরই বানানো একটি মাদুর একবার উপহার হিসেবে পৌঁছেছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের হাতে—সেই মুহূর্তেই সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল “সবংয়ের মেয়ে” গৌরীবালার নাম।

কিন্তু এ সাফল্য সহজে আসেনি। গৌরীবালার জীবন কেটেছে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। হাড়ভাঙা পরিশ্রম, পারিবারিক সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাব—সবকিছুর মাঝেও থেমে যাননি তিনি। ধৈর্য আর নিষ্ঠায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব শিল্পভাষা। আজ তিনি শুধু একজন মাদুরশিল্পী নন—তিনি এক প্রেরণা, যাঁকে দেখে গ্রামের মেয়েরা সাহস পায়, শিখতে চায়, স্বপ্ন দেখতে শেখে।

নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:https://youtube.com/@newspolebangla?si=mYrQvXTBQ1lG3NFT

এই শিল্পকে আরও পেশাদার রূপ দিতে ২০১৯ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সারতায় তৈরি হয় ‘মাদুর রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার’। এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের ডিজাইনার, শিল্পী। গ্রামের মেয়েরা শিখছেন আধুনিক নকশা, আন্তর্জাতিক বাজারের রুচি, আর সবচেয়ে বড় কথা—শিখছেন আত্মবিশ্বাসে ভর করে এগিয়ে চলা।

তবে এই সাফল্যের পথ একেবারে সরল নয়। এখনও রয়েছে কাঁচামালের অভাব, নতুন ডিজাইনের ঘাটতি, সরকারি সহায়তার সীমাবদ্ধতা। তবুও সবংয়ের মাদুর এক নিরব বিপ্লবের নাম। আর সেই বিপ্লবের সামনে রয়েছেন গৌরীবালা দাস—একজন নারী, যিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, মাটির ঘর থেকেও বিশ্বমঞ্চ জয় করা যায়।

এই শিল্প আজ শুধুই হস্তশিল্প নয়—এ এক নারীর হাত ধরে গড়ে ওঠা জীবনদর্শন। বাংলার শিকড় থেকে সোজা বিশ্বদরবারে পৌঁছনোর এক অনবদ্য স্বপ্ন।