নিউজ পোল ব্যুরো:সোমবার নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষার মুখে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির। দলীয় প্রতীক, তহবিল, পার্টি অফিস এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ— এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে কমিশনের সামনে নিজেদের দাবির সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্যপ্রমাণ জমা দেবে উভয় পক্ষ। একদিকে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘কালীঘাট’ শিবির, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ তৃণমূল। উভয় শিবিরই নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ উত্তরাধিকারী বলে দাবি করছে।
ফলে ঘাসফুল প্রতীকের ভবিষ্যৎ, দলীয় তহবিলের নিয়ন্ত্রণ, পার্টি অফিসের মালিকানা এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা এখন অনেকটাই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, উভয় পক্ষকেই নিজেদের সাংগঠনিক বৈধতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ হিসেবে নির্দিষ্ট নথি জমা দিতে বলা হয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে সোমবার বিকেলে।
সূত্রের খবর, কালীঘাট শিবিরের প্রতিনিধিত্ব করতে ইতিমধ্যেই দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন তৃণমূলের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি চূড়ান্ত করে কমিশনের সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে প্রস্তুত।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মুহূর্তে তুলনামূলকভাবে বেশি চাপে রয়েছে কালীঘাট শিবির। সূত্রের দাবি, দলীয় প্রতীক ধরে রাখা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশন যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ঘাসফুল প্রতীক নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:https://youtube.com/@thenewspole
যদিও শনিবার একটি ফেসবুক লাইভে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, *“প্রতীক কেড়ে নিয়েও কিছু করতে পারবে না। আমি যদি ঘাসফুল প্রতীক গলায় ঝুলিয়ে রাস্তায় বেরই, আটকাতে পারবে? মানুষের মনেই আসল প্রতীক থাকে।”* রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করছে।
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির জানিয়েছে, প্রতীক সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের উপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, সাংসদ, বিধায়ক এবং সাংগঠনিক প্রতিনিধিদের সমর্থনের সমস্ত তথ্য কমিশনের কাছে তুলে ধরা হবে এবং কমিশন যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা মেনে নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) ভরাডুবির পর থেকেই দলের অভ্যন্তরীণ সংকট চরমে পৌঁছায়। প্রথমে সংসদীয় দলে বড়সড় ভাঙন দেখা দেয়। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২১ জন সাংসদ এনসিপিআই-তে যোগ দিয়ে লোকসভায় পৃথক স্বীকৃতির দাবি জানান। এরপর পরিষদীয় দলেও বিভাজন স্পষ্ট হয়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬৫ জন বিধায়ক কালীঘাটের নেতৃত্বকে অস্বীকার করে পৃথক জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করেন। পরে উভয় পক্ষই নিজেদের বৈধ দল হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই কমিশন দুই শিবিরকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
এদিকে দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি পার্টি অফিস নিয়েও আলাদা পরিকল্পনা করেছে ঋতব্রত শিবির। সূত্রের খবর, শুক্রবার তৃণমূল ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ভবনের ভাড়ার চুক্তিপত্র খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। যেহেতু চুক্তিপত্র ফিরহাদ হাকিমের নামে রয়েছে এবং তিনি বর্তমানে ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে রয়েছেন, তাই ভবিষ্যতে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে চুক্তি নবীকরণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হতে পারে। তবে বৈধ আইনি প্রক্রিয়া মেনেই সমস্ত পদক্ষেপ করা হবে বলে দাবি ওই শিবিরের। ইতিমধ্যেই ভবনের রং পরিবর্তনের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সব মিলিয়ে সোমবারের এই নথি জমা এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনের রায় শুধু দলীয় প্রতীক নয়, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামো, সম্পদ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে।
