কেউ বেশিদিন তাঁর (Vidyasagar)সঙ্গে সঙ্গ দেয়নি। এমনকি ভাগ্যও না। তবু অদম্য এই মানুষটিকে রোখা যায়নি। সারা জীবন শুধু লড়ে গেছেন। ঈশ্বরচন্দ্রের বয়স ১১ ডিরোজিও মারা গেলেন, বয়স যখন ১৩ রামমোহন রায় মারা গেলেন।
রবীন্দ্রনাথ এই বিদ্যাসাগর (Vidyasagar) সম্পর্কে বলেছেন। “বাঙালি গড়তে গিয়ে বিধাতা যে কী করে একটা ঈশ্বরচন্দ্র বানিয়ে ফেললেন সেটা অতীব আশ্চর্যের।” এমন একজনের জন্মদিন ২৬ সেপ্টেম্বর । শুধু বর্ণ পরিচয় বইটির জন্য তিনি অমর হয়ে থাকবেন। রাস্তার মাইলস্টোন থেকে শেখা কাউন্টিং। কিংবা ল্যাম্পপোস্টের আলো দিয়ে পড়াশোনা করা। ওহ, এসব এখনকার জে জেনারেশনের যুগে অতটা প্রাসঙ্গিক না। তা ঠিক। কিন্তু মাতৃভক্তির নীতিকথা ? ওরে বাবা, আমাদের এই যুগে বৃদ্ধ বাবা-মাকে আমরা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার কনসেপ্ট আবিষ্কার করেছি। ফলে মায়ের ডাকে ভয়ংকর দামোদর নদ পেরিয়ে ছিলেন স্রেফ সাঁতরে। সেটাও তেমন কাজের কিনা ভেবে দেখতে হবে। কিন্তু পাশের বাড়ির যে অল্পবয়সী মেয়েটাকে শুধু বিধবা বলেই কেউ বিয়ে করতে পারছিল না, সেটা এখন যে কোন বাধাই নয় সেটাও যে এই প্রকাণ্ড মাথার লোকটার চেষ্টায় সফল হয়েছে! হ্যাঁ, বস সত্যিই এটা একটা কাজের কাজ হয়েছে। কিন্তু সেই ইংরেজ আমলে, বিশেষ করে বড়লাট ডালহৌসির আমলে সেটা একেবারেই অসম্ভব ছিল। রাজস্থানের রূপ কানোয়ারের ঘটনা এই যুগে তারপরেও ঘটেছে। সেটা ভারতের সব জায়গায় ইশ্বরচন্দ্ররা জন্মায় না বলেই। রামমোহন রায়রা বাংলার ভাগ্য বিধাতাই বানিয়ে দেন বলেই না।
[আরও পড়ুন]http://ষষ্ঠী বোধনের আগের দিন পঞ্চমী দুর্গাপুজোর গুরুত্বপূর্ণ দিন
টিকি মাথায় পণ্ডিতদের দাঁত চেপে সমস্ত অচলায়তনকে চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা আটকানো সহজ কাজ নয়। এমনকি বড়লাট ডালহৌসি হাত তুলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে শাস্ত্রের সম্মতি না থাকলে কিছু করা সম্ভব নয়। তবে জেদি ইশ্বরচন্দ্র ছাড়ার পাত্র নন। বিস্তর ঘেঁটে পরাশর সংহিতা থেকে শ্লোক তুলে আনলেন।
“নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে, ক্লীবে চ পতিতে পতৌ
পঞ্চস্বাপৎসু নারীনাং পতিরন্য বিধীয়তে”
অর্থাৎ স্বামী মারা গেলে, সন্যাস নিলে, নিখোঁজ হলে, সন্তান গ্রহণে অক্ষম হলে, কিংবা অত্যাচারী হলে স্ত্রী আবার বিবাহ করতে পারে। তখন রাধাকান্ত দেব, বঙ্কিমচন্দ্ররা ক্ষান্ত হলে বিধবা বিবাহ আইন পাশ হল। মাইকেল মধুসূদন বলেছেন যে ইশ্বরচন্দ্রের(Vidyasagar) মধ্যে ছিল প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের প্রজ্ঞা, পাশ্চাত্যের উদ্যম আর বাঙালি মায়ের হৃদয় ছিল। বিবেকানন্দ যার সম্পর্কে বলেছেন, “সমগ্র উত্তর ভারতে আমার বয়সী এমন কোন মানুষ নেই যার ওপর ওনার প্রভাব পড়ে নি”। রামকৃষ্ণ পরমহংস তার সাথে প্রথম আলাপেই অকপট বলে ফেলেন “এতদিন খাল, বিল, নদী দেখেছি। আজ সাগর দেখছি।” নিজের জীবনকালে সমসাময়িক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মধুসুদন কে পেয়েছেন, বয়সে খানিক ছোট রামকৃষ্ণ আর বঙ্কিম কে পেয়েছেন। কাছে পেয়েছেন লালনকে , বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশ বসুকে।
এই রকম মানুষের জন্ম বাঙালি বিধাতা সম্প্রতি বন্ধ করে দিয়েছেন।
