শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়:
১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ প্রয়াত হন কিংবদন্তি অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay)। চেহারায় এসেছিল ভাঙন, অবসাদের ছাপ পড়েছিল মুখে, তবু মুখের হাসি মেলাইনি। কারণ ভানুর মুখের বাঙাল কথা শুনেই হাসে যে বাঙালি। ভানু বলতেন ‘আমি মরলেও লোকে হাসবে’। ৬২ বছর বয়সে ভানু (Bhanu Banerjee) চলে যাওয়ার (passed away) দিন শোকার্ত ভিড় উপচে পড়েছিল টালিগঞ্জের স্টুডিয়ো-পাড়ায় আর চারু অ্যাভিনিউয়ে ভানুর পুরনো বাড়িতে। কিন্তু কেন এত কম বয়সে চলে গেলেন অভিনেতা? বয়স ষাট পেরিয়েছিল ঠিকই তবু চলে যাওয়ার মতো বয়স তো ছিল না তাঁর।

কৌতুকাভিনেতা (Comedian) নন, ভানু যে একজন সম্পূর্ণ অভিনেতা (Complete Actor), এ কথাটা বারবার বলতেন বরেণ্য পরিচালক তপন সিংহ। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ভানুর অনুজপ্রতিম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও একই কথা বলতেন চিরকাল।
অভিনয়ের ছোট-ছোট ডিটেলিংয়ে ভানু, জহর, তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, উৎপল দত্তের মতো শক্তিশালী অভিনেতারা অনেকেই চমৎকৃত করেন। ‘সাড়ে চুয়াত্তরে’ পরিচালক নির্মল দে-র চিত্রনাট্যও ভানুর অভিনয়ের তোড়েই পাল্টে গিয়েছিল। ‘মাসিমা মালপো খামু’ থেকে অনেক সংলাপই ভানুর ‘ইম্প্রোভাইজ়েশনে’র ফসল বলে শোনা যায়।

ভানুর প্রয়াণের আগেই তুলসী চক্রবর্তী, জহর রায়, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, নবদ্বীপ হালদারের মতো কমেডিয়ানরা আগেই মারা গিয়েছিলেন। ভানুর চলে যাওয়াতে আরও শূণ্য হল ইন্ডাস্ট্রি। রবি ঘোষ আর অনুপ কুমারের উপর বাংলা ছবির কমেডির ভার অগ্রজরা যেন দিয়ে গেলেন।
ছবির জগতে এসে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জুটি বেঁধেছিলেন জহর রায়ের (Jahar Roy) সঙ্গে। বিদেশে যেমন ছিলেন লরেল-হার্ডি, ডিন মার্টিন-জেরী লিউইস তেমন বাংলার সম্পদ ছিলেন ভানু-জহর।
ভানু জহরের জুটি নিয়ে প্রথম বাংলা ছবি হয়েছিল ‘ভানু পেল লটারি’। এরপর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’,’যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ একাধিক ছবি হয়।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে কমেডিয়ান নয় প্রধান চরিত্র করে একটি মাত্র ছবি হল ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’। যে ছবি ভানুর শ্রেষ্ঠ অভিনয়। মঞ্চে ‘নতুন ইহুদি’, সিনেমায় ‘বসু পরিবার’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ ভানুকে দেখার মুগ্ধতার কথা সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর ছবিতে শেষ পর্যন্ত ভানুর অভিনয়ের সুযোগ হয়নি।
কেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এত আগেই মৃত্যু হয়েছিল? শ্যামবাজারের মঞ্চে জীবনের শেষ পর্যন্ত থিয়েটার এবং শুটিংয়ের ধকল হয়তো তাঁর মৃত্যু কিছুটা এগিয়ে এনেছিল। ভাল কাজ করার তাগিদটা অটুট ছিল জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। যাত্রা করতেন বয়স ষাট পেরবার পর। আউটডোর আর রাত জাগা শরীরের উপর ধকল ফেলেছিল। সঙ্গে হাই সুগার। যদিও পরিবারে শান্তি অটুট ছিল তাঁর। কিন্তু কাজের প্রতি ভালবাসা হয়ে যেত তাঁর অতি পরিশ্রম। তাই মাত্র ৬২তেই আজকের দিনে প্রয়াত হন কমেডি কিং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
