নিউজ পোল বাংলা: বিজয়োল্লাস মুহূর্তে পরিণত হয়েছে বিষাদে (Bengaluru Stampeded)। হর্ষোল্লাস মিলিয়ে গিয়েছে প্রিয়জন হারানোর বুকফাটা কান্নায়। ১৭ বছর পর প্রথম ট্রফি এসেছে প্রিয় ক্লাবটিতে (RCB)। স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেট পাগল দেশে উন্মাদনা বাঁধ ভেঙেছে। রাতভর চলেছে সেলিব্রেশন। আর ইদানিংকালের ট্রেন্ড অনুযায়ী কর্ণাটক ক্রিকেট সংস্থার পক্ষ থেকেও সেই ট্রফি নিয়ে ছাদ খোলা বাসে করে ঘোরা থেকে বিজয়ীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মতো সবকিছুরই আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু ছিল না শুধু পরিকল্পনা। ভিড় সামলানোর পর্যাপ্ত তথা উপযুক্ত ব্যবস্থা। ফলে প্রিয় ক্লাবের জয়ের কারিগরদের একবার দেখার আশায় বেঘোরে চলে গিয়েছে ১১টি প্রাণ। হাসাপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে আরও ৫০টি প্রাণ।

আরও পড়ুন: RCB Victory: জনতার মৃত্যু, উল্লাসে সরকার! মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক

দীর্ঘ ১৭ বছর পর হয়েছে স্বপ্নপূরণ। মঙ্গলবার রাতে পাঞ্জাব কিংসকে হারিয়ে আইপিএলের ১৮তম বছরে এসে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। কাপ উঠেছে বিরাট কোহলির (Virat Kohli) হাতে। বুধবার তাই বেঙ্গালুরু জুড়ে ছিল সেলিব্রেশনের মুড। প্রথমে ঠিক হয় ছাদ খোলা বাসে করে বিধান সৌধ থেকে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম পর্যন্ত ট্রফি প্রদর্শনী করবেন ক্রিকেটাররা। যেমনটা ইদানিং কালে ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে আর কি! তারপর স্টেডিয়ামের ভিতরে চলবে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। এরপরেই জানানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে নাকি অনুমতি মিলছে না। এই রোড শো করলে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হতে পারে তাই বাতিল করা হচ্ছে আরসিবির ওপেন বাস প্যারেড। কিন্তু খানিক পরেই আবার আরসিবি কর্তৃপক্ষের তরফে সমাজ মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে বিকেল পাঁচটা থেকে ওপেন বাস প্যারেড হবে। পুলিশ সূত্রে খবর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে প্রবেশের ক্ষেত্রে নাকি একটি পাশের ব্যবস্থা করেছিল কর্ণাটক রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা। পুলিশের পক্ষ থেকে সকাল থেকেই বারংবার আবেদনও করা হয় পাশ বিনা কেউ আসবেন না। কিন্তু দেশটার নাম ভারতবর্ষ। আর যেখানে স্বপ্নের নায়কের নাম বিরাট কোহলি। সেখানে উন্মাদনা উত্তেজনায় কি বাঁধ থাকে?

আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে কর্ণাটক প্রশাসনের দিকে। তাঁরা নাকি এতটা ভিড় (Bengaluru Stampeded) হয়ে যাবে বুঝতে পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন মানুষের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা নাকি অনেক কম ছিল। কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া থেকে উপর মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার সকলেই উপস্থিত ছিলেন স্টেডিয়ামের ভিতরে। আর বাইরে হঠাৎই রটে যায় স্টেডিয়ামের সাত নাম্বার গেটে নাকি ফ্রি পাস বিতরণ করা হচ্ছে। হুড়মুড়িয়ে সেইদিকে ছুটে যায় মানুষের ঢল। আর এই বিপুল ভিড়ের ঠেলায় মাটিতে পড়ে যান বেশকিছু মানুষ। পরিস্থিতি হয়ে ওঠে দমবন্ধকর। পদপিষ্ট হয়ে মারা যান ১১ জন। বাইরে তখন হাহাকার অবস্থা। পুলিশ একের পর এক অসুস্থ শিশু থেকে যুবক যুবতীদের পাঁজাকোলা করে ভিড় থেকে বের করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু ভিতরে চলতে থাকে নাচ-গান-অনুষ্ঠান। যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং উপ মুখ্যমন্ত্রী।

পরিস্থিতি (Bengaluru Stampeded) সামাল দিতে লাঠিও চালাতে হয় কর্ণাটক পুলিশকে। ঘটনার খবর পেয়ে তড়িঘড়ি বাইরে বেরিয়ে আসেন ডি কে শিবকুমার। রওনা দেন স্থানীয় বোরিং হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, “এত লোক হবে বাবা যায়নি। স্টেডিয়ামের লোক ধারণ ক্ষমতার থেকেও বেশি লোক চলে আসায় বিপত্তি। এই বিশাল ভিড়ে সামলানো সম্ভব ছিল না।“ মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের কথা ঘোষণা করেছে সিদ্দারামাইয়া সরকার।

আর্থিক সহায়তার কথা ঘোষণা করেছে কর্ণাটক ক্রিকেট সংস্থা এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু কর্তৃপক্ষও। কেসসিএ এবং আরসিবির তরফে যথাক্রমে পাঁচ লক্ষ এবং ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণের (Bengaluru Stampeded) কথা বলা হয়েছে। আহতদের জন্য বিশেষ ফান্ডেরও ব্যবস্থা করেছে আরসিবি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দায় কার? কেন বেঙ্গালুরু পুলিশের বারণ সত্ত্বেও এইধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো?

সূত্রের খবর একপ্রকার জোর করেই নাকি কর্ণাটক ক্রিকেট সংস্থা এবং আরসিবির পক্ষ থেকে রোড শোয়ের আয়োজন করা হয়। ঘটা করে সমাজ মাধ্যমে তা ঘোষণাও করা হয়। সীমিত সংখ্যক ফ্রি পাসের ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানানো হয়। তবে তা আগে আসার ভিত্তিতে উপলব্ধ বলা হয়। ফলে জনতার ঢল উপচে পড়ে চিন্নাস্বামীর বাইরে। ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে থাকে পুলিশ। একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয় স্টেডিয়াম সংলগ্ন সমস্ত রাস্তা থেকে মেট্রো ইত্যাদি। কিন্তু তাতেও দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি। জয়ের কারিগরদের দেখার উদ্দেশ্যে চলে যায় ১১টি জলজ্যান্ত প্রাণ (Bengaluru Stampeded)।

আরসিবি থেকে বিরাট কোহলি -ক্রুণাল পান্ড্য-এবি ডি ভিলিয়ার্সরা সমাজ মাধ্যমে শোকপ্রকাশ করেন সকলেই। বিরাট লেখেন তিনি “বাকরুদ্ধ” হয়ে গিয়েছেন। আরসিবি টিম ম্যানেজমেন্টের তরফে ক্ষমাও চাওয়া হয়। কিন্তু এবার এই ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ করলো কর্ণাটক সরকার। বেঙ্গালুরুর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (Add CoP), ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (DCP), অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ACP), কব্বন পার্ক থানার সার্কেল ইন্সপেক্টর, স্টেশন হাউস অফিসার, স্টেশন হাউস মাস্টারসহ চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের ইনচার্জকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া।

কব্বন পার্ক থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে আরসিবি ম্যানেজমেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা ডিএনএ এবং কর্ণাটক স্টেট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (KSCA) বিরুদ্ধে। এছাড়াও বৃহস্পতিবার দুপুরে এই ঘটনার (Bengaluru Stampeded) স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শোনে কর্ণাটক হাইকোর্ট। সিদ্দারামাইয়া সরকার আদালতে জানিয়েছে যে, সিআইডির হাতে এই ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ তদন্তকারী দলও গঠন করা হচ্ছে। হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে এক সদস্যের একটি বিশেষ কমিশনও গঠন করা হয়েছে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে এই কমিশন।

নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব চ্যানেলের লিংক: https://youtube.com/@newspolebangla?si=U_3SytIHQ9lQ4Bux
তদন্ত হবে। হবে রাজনৈতিক চাপানউতরও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রলেপ পড়বে ক্ষতে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে আরসিবির প্রথমবার ট্রফি জয়। আর যে মুখ্যমন্ত্রী এতসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন তিনি নিজেও কি দায় এড়াতে পারেন? যখন বাইরে ঘটছে এইধরণের হুলুস্থুল কাণ্ড তখন স্টেডিয়ামের ভিতরে আনন্দ অনুষ্ঠানে ব্যস্ত ছিলেন তিনি এবং তাঁর ডেপুটিও। বাইরে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেলেও থামেনি অনুষ্ঠান! আর বুধবার দুপুর ৩:৫১ নাগাদ খোদ কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীর এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করা হয়, যেখানে জানানো হয় বিকেল চারটে থেকে বিধান সৌধের সামনে ক্রিকেটারদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষও সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারে বলে লেখা ছিল পোস্টটিতে। ফলে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও কি দায় এড়িয়ে যেতে পারেন? উত্তরটা বোধহয় চিন্নাস্বামীর বাইরে পড়ে থাকা হাজার হাজার চটি-জুতো-স্লিপারগুলোই জানে!
