Girish Park Puja: উদ্বোধনে মমতার মন্তব্য মিলেমিশে থাকার

breakingnews কলকাতা শহর সংস্কৃতি

তপন দেঃ গিরীশ পার্কের সকালটা যেন অন্য রকম আলোয় ভেসে উঠেছিল শুক্রবার। মন্ডপের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হাজার মানুষের মুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা— ছেষট্টি বছরের ইতিহাসে আজ আবার এক নতুন অধ্যায় লেখা হতে চলেছে। কলকাতার পুরনো ঐতিহ্যের এক সার্বজনীন পুজো, নাট্যাচার্য গিরীশ ঘোষের নাম অনুসারে। উদ্বোধনের আবহাওয়ায় যেন শহরের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিশে গেছে মানুষের উদ্বেল আকুলতা। প্রতি বছরই কিছু না কিছু নতুন ভাবনা আসে এখানে, কিন্তু এবারের থিম “শাক্ত সুধা সিন্ধু ”— শুনলেই মনে হয় ধর্মের দেয়াল ভেঙে আত্মিক মিলনের উৎসব। শিল্পী দীপাঞ্জন দের হাত ধরে যেখানে বাংলার শ্যামা সংগীতের রূপরেখা প্রাণ পেয়েছে। “মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠনা ফুটে মন।” “আমার চেতনা চৈতন্য করে দে মা চৈতন্যময়ী”,”দোষ কারো নয় গো মা”, আমায় একটু জায়গা দাও- পান্নালাল ভট্টাচার্য থেকে মান্না দের উদাত্ত কণ্ঠে মাকে প্রাণভরে নয়নজলে ডেকে ওঠার গান তো নয়, যেন আকুতির আর্ত ক্রন্দন। সে ডাকে গিরীশ ঘোষের গুরুদেব পরমহংস( যিনি জল মেশানো দুধের থেকে শুধু দুধটুকুই তুলে নেন) রামকৃষ্ণ যেমন সাড়া পেয়েছেন। যুগ যুগ ধরে উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যশালী পুজো পথ খুঁজে পেয়েছে। পুজোর উদ্যোক্তা প্রদীপ মজুমদার দীর্ঘবছর ধরে এই পুজোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সাধারণ সম্পাদক সৌম্য বকসীর তো কথাই নেই। চতুর্দিকে নজর রেখে দেখে নিচ্ছেন। যেন কোন খামতি না থাকে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে যে পুজোর উদ্বোধন সেখানে কি ফাঁক থাকলে চলে!

[আরও পড়ুন]  http://কালীপুজোর প্রাক্কালে বিধাননগরে পুলিশি তল্লাশি, উদ্ধার ১৫০ কেজির বেশি নিষিদ্ধ বাজি
বিকাল চারটেতে মন্ডপে প্রবেশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চারদিকের ঢাকের আওয়াজে ভরে উঠল । তাঁর চোখ জুড়ে ছিল শান্ত স্বপ্ন— বাংলার প্রতিটি পূজো যেন কেবল উৎসব নয়, এক মানবিক বার্তার বাহক। উদ্বোধনের পর তিনি বললেন, “সর্বধর্ম সমন্বয়ই বাংলার মূল সুর, মা যেন সবার মঙ্গল করেন।””ধর্ম যার যার- উৎসব সবাকার।” সেই মুহূর্তে জনতার হাততালিতে হারিয়ে গেল কথা, যেন এই শহর আবার একবার নিজের উদারতার শপথ নিল। মন্ডপের ভেতর আলো-ছায়ার খেলা।
শিল্পীরা দীপাঞ্জন দে’র গাইডে দারুণ নিপুণতায় ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার শক্তির আরাধনার অবিস্মরণীয় শ্যামা সংগীতের কোলাজ , যেখানে প্রাণ পেয়েছে দেবীমায়ের আরাধনার কালচিত্র। সেই চালচিত্রের দিকে তাকালেই সুর আর তাল ছড়িয়ে পড়বে মণ্ডপের কোণায় কোণায়। মায়ের মহিমা শুধু এক ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সব বিশ্বাসের সংযোগস্থলে তাঁর আসন। গল্পটা এগোয় আলোছায়ায়— সুতোর মতো জুড়ে যায় নদী, মাটি, ইতিহাস আর মানুষের বিশ্বাস। পাশে ঠাকুরদালানে নারকেল, ফল, প্রদীপের সুবাসে মিশছে ঢাকের তাল, যেন শহরের হৃদয় নাচছে একসাথে।পুজোর প্রাচীনে ফিরে গেলে জানা যায়, গিরিশ পার্ক সার্বজনীন পুজো শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পরের উত্তাল সময়ে। তখন সাম্প্রদায়িক বিভেদের ছায়া ছিল ঘন, আর এখানকার মানুষেরা চেয়েছিলেন— সবাই যেন একসাথে মাকে ডাকে, একসাথে প্রার্থনা করে। সেই উত্তরাধিকার আজও বজায় আছে, আর এ বছর সেই ঐতিহ্য নতুন বার্তায় পুনর্জীবিত হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্বোধন ও তাঁর সর্বধর্ম সমন্বয়ের আহ্বানে। রাতের শেষে মন্ডপে দাঁড়িয়ে যখন পুজোর বাতাসে মিলিয়ে গেল ঢাকের শেষ তাল, তখন দূরে আকাশে জ্বলল একচিলতে চাঁদ। কেউ কেউ বলল, “দেখো, মা হাসছেন।” সেই হাসির মধ্যে লুকিয়ে ছিল শহরের হৃদয়, আর গিরিশ পার্ক সার্বজনীন পুজোর ছেষট্টি বছরের ইতিহাসে যোগ হলো এক নতুন অধ্যায়— একতার, মিলনের, আর মানুষের ভালোবাসার গল্প। রেকর্ড ভিড় সামাল দেওয়ার জন্য তৈরি গিরীশ পার্ক সার্বজনীন পুজো। ইতিহাসের খাতায় আরও একটা সাফল্যের পালক নিজেদের মাথায় তুলে নিতে স্বেচ্ছাসেবী থেকে প্রশাসন তৈরি। বাকিটা শ্যামা মায়ের ইচ্ছা।