নিউজ পোল ব্যুরো:কলকাতার সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ (Gopal Mukherjee Road Kolkata) করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। কলকাতা পুরসভার এই সিদ্ধান্তকে রবিবার স্বাগত জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ দিবসের শুভক্ষণে সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে স্বর্গীয় গোপাল মুখার্জির নামে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করার জন্য কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের গৃহীত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। এটি শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন।’’
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এমন এক ব্যক্তির নামে পরিচিত ছিল, যাঁর নাম দেশভাগ-পূর্ব সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং রক্তক্ষয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বলে বিতর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, সেই স্থানে সাহস, আত্মত্যাগ এবং প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে গোপাল মুখার্জিকে (Gopal Mukherjee Road Kolkata) সম্মান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রকৃত নায়কদের’ স্মরণ এবং ইতিহাসের ‘ভুল সংশোধনের’ প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
যদিও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হলেও, এ বিষয়ে কলকাতা পুরসভার তরফে এখনও পর্যন্ত বিস্তারিত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৬ সালের ১৬ অগস্ট মুসলিম লিগ ঘোষিত ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-কে ঘিরে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিতি পায়। সে সময় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হুসেন শহীদ সুরাবর্দি। তাঁর প্রশাসনিক ভূমিকা এবং ওই হিংসা রোধে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাসবিদদের একাংশের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের একাংশ সুরাবর্দিকে ওই ঘটনার জন্য দায়ী করলেও, অন্য অংশের গবেষকদের মতে, পরিস্থিতি ছিল বহুমাত্রিক এবং তার দায় এককভাবে কোনও ব্যক্তির ওপর চাপানো যায় না।
অন্যদিকে, গোপাল মুখোপাধ্যায়, যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে অধিক পরিচিত, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক অশান্তির সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে বিভিন্ন মহলে প্রচলিত রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের দাবি, তৎকালীন সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা কলকাতার একাধিক এলাকা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেন। যদিও তাঁর ভূমিকা নিয়েও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এদিকে, রাস্তার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই নতুন বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ইতিহাস-গবেষকদের একাংশের দাবি, সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নামকরণ আদৌ হুসেন শহীদ সুরাবর্দির নামে হয়েছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, রাস্তার নামটি সম্ভবত কূটনীতিক, অনুবাদক ও শিল্পসমালোচক হাসান শহীদ সুরাব্দির স্মৃতিতে রাখা হয়েছিল, যিনি হুসেন শহীদ সুরাবর্দির আত্মীয় ছিলেন। যদিও এই দাবিরও সর্বসম্মত ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নেই।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:https://youtube.com/@thenewspole
ফলে, রাস্তার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয়েছে, তেমনই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, স্মৃতির রাজনীতি এবং জনপরিসরে কাদের স্মরণ করা হবে — সেই প্রশ্নও।
