নিউজপোল ব্যুরো: দুর্গাপুজোর মহাস্নানে এমন এক উপকরণ রয়েছে, যার নাম শুনলেই চমকে উঠতে পারেন অনেকেই! দেবীর মহাস্নানের উপকরণের তালিকায় রয়েছে ‘বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা’। প্রশ্ন উঠতেই পারে—যে মাটিকে সমাজের চোখে একসময় ‘অশুদ্ধ’ বলে দেখা হয়েছে, সেই মাটিই কেন দেবীর পুজোর গুরুত্বপূর্ণ আচারে জায়গা পেল? এর পিছনে কি শুধুই কোনও প্রাচীন রীতি, নাকি রয়েছে শুদ্ধ-অশুদ্ধের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবার মতো কোনও গভীর বার্তা?
দুর্গাপুজোর বিভিন্ন প্রাচীন আচারে নানা জায়গা থেকে মাটি সংগ্রহের কথা পাওয়া যায়। গঙ্গা, নদীর দুই পাড়, রাজদ্বার, চতুষ্পথ, বৃষশৃঙ্গ, গজদন্তের মতো নানা উৎসের মাটির পাশাপাশি উল্লেখ রয়েছে ‘বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা’রও। স্বাভাবিক ভাবেই এই শব্দের অর্থ এবং ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল রয়েছে। তন্ত্রশাস্ত্রে ‘বেশ্যা’ শব্দটির একটি আলাদা অর্থও রয়েছে। কিছু তান্ত্রিক গ্রন্থে ‘বেশ্যা’ নামে এক ধরনের সাধিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই কারণে একটি মত হল, ‘বেশ্যাদ্বার’ বলতে হয়তো সেই সাধিকার বাড়ির দরজাকে বোঝানো হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যার পক্ষে দুর্গাপুজোর প্রাচীন পদ্ধতি বা টীকায় সরাসরি প্রমাণ কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আবার অগ্নিপুরাণের ২১৮ অধ্যায়ে ‘বেশ্যাদ্বারমৃদা’র উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে রাজ্যাভিষেকের একটি আচারে এই মাটি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেটি দুর্গাপুজোর নিয়ম নয়। ফলে সেই উল্লেখকে সরাসরি দুর্গাপুজোর ‘বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা’র ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না। তাহলে এর অর্থ কী? নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে বিষয়টিকে আরও সতর্ক ভাবে দেখা প্রয়োজন। একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যায়, মহাস্নানের জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি সংগ্রহের মধ্যে সমাজ ও জীবনের নানা পরিসরকে একসঙ্গে যুক্ত করার প্রতীকী ভাবনা থাকতে পারে। অর্থাৎ দেবীর আরাধনায় কোনও নির্দিষ্ট জায়গা বা মানুষের জীবনকে একেবারে বাদ না দিয়ে বৃহত্তর সমাজের নানা স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি ভাবনা এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
তবে এটিকে শাস্ত্রকারদের নিশ্চিত উদ্দেশ্য বলে দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তাই ‘বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা’ নিয়ে একদিকে যেমন তান্ত্রিক ব্যাখ্যা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে সাধারণ অর্থের ব্যাখ্যাও। কোনটি সঠিক, তা নিয়ে গবেষণার জায়গা এখনও খোলা।
