শুভম দে: মহেন্দ্র সিং ধোনি (Mahendra Singh Dhoni)। তাঁকে ঘিরে আবেগ, উন্মাদনা, উচ্ছ্বাসের বন্যা বইবে আজ সারাদিন ধরে। কারণ আজ তাঁর ৪৪ তম জন্মদিন। আবার কিছু মানুষ স্বভাববশত নাকি কান্না কাঁদবেন। সবটাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মানুষটা, যাকে ঘিরে এতকিছু তাঁকে কি এসবকিছু ছোঁয়? নাহ্। তিনি বরাবরের মতই নির্লিপ্ত। মানুষের তাঁকে ঘিরে এত বাঁধভাঙা উন্মাদনার মধ্যেও কি করে এতটা অনাসক্ত থাকেন তিনি? উত্তরটা তাঁর স্মিতহাস্যের রহস্যের মতোই অজানা।
আরও পড়ুন: BCCI: এজবাস্টনে জিতেও চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে ভারত
কিন্তু যারা প্রশ্ন তোলেন তাঁকে (Mahendra Singh Dhoni) ঘিরে এই সীমাহীন আবেগের দিকে তাদের উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন, আচ্ছা কেন হবে না বলুন তো? দেশটাকে তিন খানা আইসিসি ট্রফি এনে দেওয়া মানুষটাকে ঘিরে এইটুকু হবে না? এই তো এবার রে রে করে আসবেন যে ধোনি একা কাপ জিতেছিল? বাকি ১০ জন কি ঘাস কেটেছিল? আপনি কি প্রশ্ন করবেন মশাই একসময় এ প্রশ্ন অবিরাম অনাবরত আমি করতাম। কিন্তু আজ আমি উত্তরটা খুঁজে পেয়ে গিয়েছি।

কিছু প্রশ্ন আমি সাজিয়ে দিচ্ছি সেগুলো নিজেকে করে উত্তরগুলো খোঁজার চেষ্টা করুন। যদি না ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ ধরণের মানসিকতার বশবর্তী হয়ে থাকেন তাহলে উত্তরগুলো আপনিও খুঁজে পাবেন।
নাহ্ ধোনি (Mahendra Singh Dhoni) একা বিশ্বজয় করেননি কোনোভাবেই। বাকি ১০ ভারতীয়র সম্মিলিত সমবেত প্রচেষ্টাতেই ভারতবর্ষ বিশ্বসেরা হয়েছে। এবিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। থাকতে পারেনা। কিন্তু ২০০৭, ২০১১ যে দল নিয়ে ধোনি বিশ্বসেরা হয়েছেন তার থেকে ভালো এগারো পরবর্তীকালে অন্য কোনো ক্যাপ্টেন পাননি বলছেন? বছর তিনেক আগে প্রাক্তন ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি অ্যান্ডি রবার্টস বলেছিলেন যে, ৮৩ ‘র বিশ্বকাপে কপিল দেবের নেতৃত্বে যে ভারতীয় দল তাঁদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে সেই দলের মধ্যে নাকি সেরকম কোনো মালমশলা ছিল না বিশ্বকাপ জেতার মতো। ভাগ্যক্রমে জিতেছিল তারা।
এখন একটা কথা ময়দানে বহুল প্রচলিত যে একজন অধিনায়ক নাকি ততটাই ভালো যতটা ভালো তার দল। সে তো অবশ্যই। কিন্তু উল্টোটাও তো সত্য যে একজন অধিনায়ক তখনই সফল যখন তিনি তার বাকি খেলোয়াড়দের থেকে তাদের সেরাটা নিংড়ে নিতে পারেন। এগারোজনকে একসূত্রে গেঁথে গড়ে তুলতে পারেন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী একটা গোটা আসমুদ্র হিমাচল। নিজের দলকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন — এসো, ঝাঁপাও, নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দাও, আমরাও পারি সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দাও।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মবিশ্বাসটা ভীষণ জরুরী জানেন তো। পোটেনশিয়ালিটি থাকলেও আপনি সফল হতে পারবেন না যদিনা নিজের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাসটা আপনি খুঁজে পান যে আপনিও পারবেন। কপিলদেব ৮৩ -র দলে সেই আত্মবিশ্বাসটা জাগাতে পেরেছিলেন তাই তিনি বিশ্বজয় করতে পেরেছিলেন। আর মহেন্দ্র সিং ধোনিও (Mahendra Singh Dhoni) যেটা খুব ভালোভাবে পারেন এবং আজও করে চলেছেন। তা সে ২০০৭ -এ শেষ ওভারে যোগিন্দার শর্মার হাতে বল তুলে দেওয়াই হোক বা ১১ -তে ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে ওপরে নিয়ে আসা হোক বা ১৩ -র চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ১৮ তম ওভারে ইশান্ত শর্মাকে নিয়ে এসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া। ব্যর্থ হলে কিন্তু সব দায় ধেয়ে আসতো তাঁর দিকেই। তাহলে সফলতার শিকিভাগ তিনি পাবেন না কেন?

কয়েক বছর আগেও এই বছর ৪০ পেরিয়ে যাওয়া বুড়ো ধোনিও (Mahendra Singh Dhoni) ডেভন কনওয়ে, তুষার দেশপান্ডে, রাজবর্ধন হাঙ্গারেকরদের মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ২০১৮, ২০২১, ২০২৩ -এই তিনবছর চেন্নাইয়ের দল দেখুন। কোনো বড়ো নাম নেই। তবু এই ভাঙাচোরা দল নিয়ে চেন্নাই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ব্যাট হাতে তাঁর অবদানই নেই সেরকম। যতই হোক বয়স তো হচ্ছে। ব্যাট হাতে আর টাইমিং হয়না আগের মতো। কিন্তু মাহিভাই জানে তার খেলোয়াড়দের থেকে সেরাটা বার করে নিতে। মাহিভাই ভরসা জোগান উইকেটের পেছনে থেকে। আত্মবিশ্বাস জোগান। জাগান লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে স্বয়ং ভগবান অস্ত্র হাতে ধরেননি। তবু পুরো মহাভারতের নায়ক তিনিই। আজকের ধোনিও ঠিক তাই। এতটুকুও অত্যুক্তি হবেনা। নাহলে সুনীল গাভাস্কার বলতে পারেন যে আইপিএলে খেলার সুযোগ যদি পেতেন তাহলে ধোনির দলে খেলতে চান শুধুমাত্র এটা দেখার জন্য যে ক্যাপ্টেন কুল কীভাবে দলটাকে চালনা করেন।

আর হয়তো কটা দিন। কতগুলো দিন তা কেউ জানেনা। তিনি আচমকাই ইতি টানবেন। হঠাৎ করেই নেমে দাঁড়াবেন কপিধ্বজ থেকে। সর্বকালের সেরা ফিনিশার জানেন কখন ফিনিশ করতে হবে। তাই যেকটা দিন তিনি আছেন মুহূর্তগুলো শুধু উপভোগ করুন। অনুভব করুন। ব্যাট হাতে নেমে কখনো শূণ্য রানে আউট হয়ে ফেরেন বা কখনো একটা দুটো বাউন্ডারি দেখা যায় তাঁর ব্যাট থেকে আবার বেশীরভাগ সময় তো নামেনই না। তবু তাঁকে একঝলক দেখার জন্য নিমেষে শেষ হয়ে যায় চেন্নাই ম্যাচের টিকিট, জাদেজাকে শুনতে হয় আউট হওয়ার আবেদন! ড্রেসিংরুম থেকে যখন তিনি বেরিয়ে আসেন মাঠে কান পাতা দায়। তিনি না নামলে মুখভার জনতার। সবটাই কি আর এমনি এমনি? এমনি এমনিই এতখানি আবেগ? আবেগ দিয়ে ক্রিকেট কেন কোনো খেলাই খেলা যায়না। কিন্তু এই আবেগ টুকুই তো সম্বল। নাহলে সবটাই গুরুত্বহীন।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব চ্যানেলের লিংক: https://youtube.com/@thenewspole?si=p1afHpHJWa5-cEhQ
ভেবে দেখবেন কথাগুলো ঠিক বললাম না ভুল। অবশ্য ভেবে দেখবার দায় কারোর নেই। ঠিক যেমন তাঁর ব্যাট ঝলসে উঠুক বা না উঠুক তাতে এত কোটি কোটি মানুষের কিছু যায় আসেনা। ঠিক যেমন সমালোচনা হোক বা প্রশংসা তাতে ধোনিরও কিছু যায় আসেনা। ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিনায়ক হয়েও তিনি শান্ত। তিনি সৌম্য। এসবকিছুর অনেক অনেক উর্দ্ধে তিনি। কানে কানের, হাতে ট্যাটু আর চাপদাড়ির যুগে কাঁচা-পাকা দাঁড়ি, স্মিতহাসি মুখে নিয়ে লক্ষ্যে অবিচল এক সাধক তিনি। তিনি কখন থামবেন সেই নিয়ে চিন্তা নাই বা করলেন। থাক না। ‘এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না!’
শুভ জন্মদিন ক্যাপ্টেন কুল! (Mahendra Singh Dhoni)
