অর্ডার, অর্ডার!
ঘটনার পাঁচদিন পরে মুখ খুললেন বিচারপতি। প্রায় একইসঙ্গে একশনে গেল বার কাউন্সিল। অভিযুক্ত আইনজীবীকে বার এসোসিয়েশন থেকে বহিষ্কার করা হল অবশেষে। অন্যদিকে যার দিকে জুতো ছোড়াকে(Shoe Debate) কেন্দ্র করে সারা দেশ তোলপাড় সেই চিফ জাস্টিস গাভাই পুরো বিষয়টি ভুলে গেছেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। আর দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্ত আইনজীবীকে আড়াল করতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর মুখ খোলায় আপাতত বেশ বিড়ম্বনায় এই ধর্মীয় দলের মুখ। বিষয়টা এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি জাতীয় সমস্যায় ঠেকেছে। একদিকে সংবিধান। অন্যদিকে ধর্মের ধ্বজার রক্ষা । কেননা অভিযুক্ত আইনজীবী “পরমাত্মার” নির্দেশে ওই কাজটি করেছিলেন, এবং মোটেও অনুতপ্ত নন।
২০০৮ সালে জুতো ছুঁড়ে(Shoe Debate)মেরে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল ইরাকি সাংবাদিক, বুশের দিকে। সেই সাংবাদিকের শাস্তি হয়েছিল। অতীতে জুতো ছোঁড়ার ঘটনার চাঞ্চল্যকর এরকম বহু আছে। কিন্তু ভারতের এই ঘটনা বিস্মিত করেছে সবাইকে, ভিন্ন কারণে। এমন একটি ঘটনাই আজ রাজনীতির ধর্মীয় আবহকে উলটো মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন ধর্মের নামে এক আইনজীবীর বিচারপতিকে জুতো ছোঁড়ার ঘটনা শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা।
[আরও পড়ুন] http://SIR নিয়ে একটু বেশি উৎসাহিত রাজ্য বিজেপি
যেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রঙ দিলেন, সেদিনই দায় মাথায় তুলে নিলেন দলটি। বার অ্যাসোসিয়েশন দোষী আইনজীবীকে বহিষ্কার করায় স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে—বিচারব্যবস্থা এখন নিজের মর্যাদা রক্ষায় আরও দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষা ও প্রতিক্রিয়া, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী স্তরে, যখন বিভাজনের আগুনে ঘি ঢালে, তখন “ধর্ম” আচমকা হয়ে ওঠে ধর্ম নয়, ভোটের অস্ত্র। ফলেই দেখা যাচ্ছে, এই ঘটনার পর বিজেপির অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে দ্বন্দ্ব — একাংশ মনে করে কঠোর বার্তা দেওয়া উচিত, অন্য ভাগ আবার আশঙ্কা করছে যে এতে দলের বৃহত্তর ধর্মীয় ভাবমূর্তি ধাক্কা খেতে পারে। আজকের ভারতের রাজনীতিতে ধর্ম যতটা ভক্তির বিষয়, ততটাই ক্ষমতার সংখ্যাগণিতের অঙ্ক। বিচারপতির মর্যাদার ওপরে যদি কোনো ধর্মবিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য দাঁড়ায়, তবে সেটাই প্রকৃত সংবিধান বিরোধিতা। তাই প্রশ্নটা এখন শুধু ওই এক আইনজীবীর “অপরাধ” নয়, বরং এক বিপজ্জনক রীতির—ধর্ম দিয়ে বিচার, মতপ্রকাশ, এমনকি রাষ্ট্রের ভূমিকা পর্যন্ত নির্ধারণের চেষ্টা। বিজেপির সামনে এখন এক কঠিন সমীকরণ—ধর্মের রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া মানে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাত, আবার পিছিয়ে আসা মানে নিজেদের মূল ভোট-ব্যাঙ্ককে দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলা। তাই আজ প্রশ্ন একটাই—শ্যাম রাখবেন না কুল রাখবেন? যদি সত্যিই “রাষ্ট্রধর্ম” না থাকে, তবে এখনই সময় সরকার ও দলের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকে উপরে তোলার, নিচে নয়। নচেৎ এই জুতোর শব্দই ভবিষ্যতের রাজনীতিতে বিজেপির জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে আসার পটভূমি হয়ে যাওয়ার আশংকাকে জিইয়ে রাখা।
