নিউজপোল ব্যুরো: বিদ্যার মন্দির নাকি ঐতিহ্যের শ্মশান? রাজনৈতিক লড়াই, স্লোগান আর অন্ধ হিংসার আঁচে এবার ছাই হয়ে গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু দশকের ঐতিহ্য! বুধবার রাতের ছাত্র রাজনীতির রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব কেবল ছাত্রদের রক্তাক্ত করেই থামেনি, তা সরাসরি আঘাত হেনেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা ও ঐতিহ্যের ওপর। ক্যাম্পাসের মূল ফটকে থাকা ঐতিহাসিক এমব্লেম পা দিয়ে মারিয়ে চুরমার করে দেওয়ার এক নজিরবিহীন ও মর্মান্তিক দৃশ্য সামনে আসতেই ফুঁসে উঠেছে গোটা বাংলা। যে প্রতীকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের শিক্ষা ও আবেগের ইতিহাস, তা কীভাবে গুড়িয়ে গেল নৈরাজ্যের আগুনে?
ঘটনার ভিডিও ও ছবি সামনে আসার পর শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। দেখা যাচ্ছে, এমব্লেমের একটি ভাঙা অংশ মাটিতে পড়ে রয়েছে। অন্য একটি দৃশ্যে গেটের ফাঁক দিয়ে সেই ভাঙা অংশ ছুড়ে ফেলার অভিযোগও সামনে এসেছে। কে বা কারা এই ভাঙচুরের জন্য দায়ী, তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। একাধিক পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। তাই ঘটনার দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্তের উপরই নির্ভর করবে।
তবে বিতর্কের সবচেয়ে বড় কারণ এই প্রতীকের ইতিহাস। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই এমব্লেম শুধুই একটি চিহ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। পদ্মের পাপড়ির বলয়ের মাঝে একটি প্রদীপ এবং তিনটি শিখার নকশা জ্ঞানের আলো ও শিক্ষার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এই নকশার সঙ্গে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নামও জড়িয়ে রয়েছে। ফলে এমব্লেমের একাংশ ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পড়ুয়া এবং প্রাক্তনীদের একাংশ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিংহ এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, জাতীয় গৌরব ও জ্ঞানের প্রতীককে অসম্মান করা হয়েছে। তাঁর নিশানায় রয়েছে ABVP। অন্যদিকে, এই অভিযোগ ও ঘটনাকে ঘিরে পাল্টা রাজনৈতিক বক্তব্যও সামনে আসছে। বুধবার রাতের অশান্তিতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ, গেট নিয়ে টানাটানি এবং ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যও। তাঁর বক্তব্য, ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখার জন্য আগে থেকেই বিভিন্ন পক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও তার শিকড় আরও পুরনো জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতীক আজ ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকার দৃশ্য তাই অনেকের কাছেই গভীর আঘাতের। প্রশ্ন উঠছে—রাজনৈতিক মতের লড়াই চলতেই পারে, প্রতিবাদও গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই লড়াইয়ের মাঝে কি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগকে এভাবে ভেঙে পড়তে হবে?
যাদবপুরের লড়াই এখন শুধু ছাত্র রাজনীতির নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নও—আর সেই প্রশ্নের উত্তর চাইছেন বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালোবাসা অসংখ্য মানুষ।
