সুমনা আদক, লন্ডন : ১৯৮২ সাল। লন্ডনের এক শীতল অক্টোবরের বিকেল। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, অথচ ছোট এক ভাড়াবাড়ির ঘরে তখন এক অন্যরকম উষ্ণতা। হাতে ধূপ, কপালে সিঁদুর, আর একদল বাঙালি প্রবাসীর চোখে উৎসবের আলো। সেই ছোট্ট ঘরেই প্রথমবার উচ্চারিত হয়েছিল “জয় মা কালী!” কৃষ্ণা ঘোষ নামের এক অনুপ্রাণিত বাঙালি নারী সেই দিন থেকেই শুরু করেন এক ইতিহাস লন্ডন কালীবাড়ির পুজো।
আরও পড়ুন: NitishKumar Reddy Record : অভিষেকই রেকর্ড নীতিশের
কৃষ্ণা ঘোষের স্বপ্ন ছিল সোজা, কিন্তু গভীর। বিদেশে থেকেও যেন মানুষ না ভোলে নিজের সংস্কৃতি, নিজের দেবী, নিজের শিকড়। ১৯৮২ সালের সেই প্রথম পুজো ছিল একেবারেই ঘরোয়া একটি কাঠের টেবিলকে বেদি করে সাজানো হয়েছিল মায়ের ছবি, পাশে রাখা হত ফুল, ধূপ, ফল আর একটুখানি ভক্তি। কিন্তু সেই ভক্তির শক্তিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক বিশাল সামাজিক উৎসবে।
বছর ঘুরে যখন ১৯৮৫ আসে, তখন কৃষ্ণা ঘোষের পুজোতে অংশ নিতে শুরু করেন আরও অনেক বাঙালি পরিবার। কেউ নিয়ে আসে মিষ্টি, কেউ ফুল, কেউবা নিজের হাতে তৈরি আলপনা। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক অন্যরকম পরিবার যেখানে কোনো আত্মীয়তার বন্ধন নেই, তবুও সবাই একে অপরের আপন। তখন থেকেই “লন্ডন কালীবাড়ি” নামটা হয়ে ওঠে এক অনুভূতির নাম।

৯০-এর দশকে এই পুজো ছড়িয়ে পড়ে সাউথ লন্ডনের নানা প্রান্তে। বড় হলে প্যান্ডেল, ঢাকের শব্দ, আর সান্ধ্য আরতিতে ভেসে যায় শহরের গলি। শুধু বাঙালি নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষও আসতে শুরু করে মায়ের আরাধনায়। তখন থেকেই শুরু হয় ‘অভিনবত্বের’ ঐতিহ্য—প্রতিবছর নতুন ভাবনা, নতুন থিম, নতুন শিল্পরূপ। কখনো মা কালীকে দেখা গেছে শান্ত, স্নেহময়ী মাতৃরূপে; কখনো আবার তিনি শক্তির প্রতীক, যিনি অন্ধকারের মধ্যে আলো খুঁজে দেন। ২০০০ সালের পর থেকে লন্ডন কালীবাড়ির পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং হয়ে উঠেছে বাংলা সংস্কৃতির এক উৎসব। মঞ্চে উঠে রবীন্দ্রনৃত্য, নাটক, কবিতা আবৃত্তি, আর শিশুদের ‘সারেগামা’ প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশ। কৃষ্ণা ঘোষ সবসময় বলতেন, “এ পুজো শুধু দেবীর নয়, আমাদের ঐক্যের প্রতীক।”
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:- https://youtube.com/@thenewspole
প্রতিবছরই থাকে এক ‘অভিনবত্ব’ কখনো থিম হয় পরিবেশ রক্ষা, কখনো নারীশক্তির জাগরণ, আবার কখনো বাঙালির হারানো ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। ২০১০ সালে ‘গ্রিন পুজো’ ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু প্লাস্টিকবিহীন সাজ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ, আর বায়োডিগ্রেডেবল প্রতিমা। ২০১৬ সালে পুজোর মূল ভাবনা ছিল “মা জগৎজননী, মা—প্রবাসীর মা”, যেখানে প্রদর্শিত হয় এক প্রবাসী সন্তানের মানসিক টানাপোড়েন এবং মায়ের প্রতি তার অন্তহীন ভালোবাসা। আজ, চার দশক পেরিয়ে, লন্ডন কালীবাড়ির পুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কৃষ্ণা ঘোষ আজ শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর শুরু করা পথ আজও জ্বলজ্বল করছে। তাঁরই হাত ধরে গড়ে ওঠা এই পুজো এখন প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষকে একত্র করে, লন্ডনের হিমেল বাতাসে ছড়িয়ে দেয় শঙ্খধ্বনি, ঢাকের তালে তালে মাতিয়ে তোলে মন।বিদেশের মাটিতে মা কালী যেন এই পুজোর মাধ্যমে বলে ওঠেন—“আমি তোমাদের কাছেই আছি, ভাষা আর দেশের সীমার বাইরে।” এটাই তো লন্ডন কালীবাড়ির পুজোর আসল অর্থ এক টুকরো বাংলা, বিশ্বাস আর ভালোবাসা, যা শুরু হয়েছিল কৃষ্ণা ঘোষের এক ছোট্ট উদ্যোগ থেকে, আর আজ হয়ে উঠেছে প্রবাসে বাঙালির গর্ব, তার আত্মপরিচয়ের আলো।
