নিউজ পোল ব্যুরো:রাজ্য বিধানসভার চলতি অধিবেশনে সোমবারই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) সংক্রান্ত বিল (West Bengal UCC Bill) পেশ হতে পারে বলে জোর জল্পনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিলটি বিধানসভায় উত্থাপিত হলে তা ঘিরে তুমুল বিতর্ক এবং তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষত, বর্তমানে বিধানসভায় বিরোধী শিবিরে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের দুই পৃথক গোষ্ঠী— ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির এবং কালীঘাট শিবির— উভয়েই ইউসিসি-সহ সরকারের আনা একাধিক বিলের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রের খবর।
‘আসল’ তৃণমূলের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, শুধু ইউসিসি নয়, সরকারের প্রস্তাবিত ‘গুন্ডাদমন বিল’-সহ অধিবেশনে উত্থাপিত সমস্ত বিতর্কিত বিলেরই কড়া বিরোধিতা করবে তাঁদের দল। বিধানসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, ইউসিসি বিলটি সম্ভবত অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে পেশ করা হতে পারে। বিলটি উত্থাপিত হলে বিরোধী দলনেতাসহ বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের বক্তব্য রাখার জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে অসম, উত্তরাখণ্ড এবং গুজরাট— এই তিন রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর রয়েছে। এবার বিজেপি-শাসিত পশ্চিমবঙ্গেও একই পথে হাঁটার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, বিলটিকে আইনে পরিণত করার বিষয়ে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যদিও শাসক শিবিরের অনুমান, বিলটি বিধানসভায় পেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধীরা প্রবল আপত্তি জানাবেন। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও সরকারপক্ষ আগাম প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
অন্যদিকে, কালীঘাট তৃণমূলও সোমবারের অধিবেশনে ইউসিসি-সহ সরকারের আনা বিলগুলির বিরুদ্ধে সরব হওয়ার কৌশল চূড়ান্ত করেছে। তাঁদের নির্বাচিত বিরোধী দলনেতা তথা বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বিধানসভায় দলের অবস্থান তুলে ধরবেন বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষও আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। বিধানসভার ভিতরে ও বাইরে সরকারবিরোধী অবস্থান আরও জোরালো করার প্রস্তুতির কথাও স্পষ্ট করেছে দুই তৃণমূল শিবির।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:https://youtube.com/@thenewspole
বিধানসভা সূত্রের খবর, বিলের উপর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের জন্যও সময় নির্ধারিত হয়েছে। পাশাপাশি বিরোধী দলনেতা ও অন্যান্য সদস্যদের বক্তব্যের সময়সীমাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, অসম, উত্তরাখণ্ড এবং গুজরাটে কার্যকর ইউসিসি আইনের অনুলিপি ইতিমধ্যেই বাংলায় সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই আইনগুলির বিভিন্ন ধারা খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নগুলি চিহ্নিত করেছে আইন দপ্তর। বিধানসভায় বিরোধীদের সম্ভাব্য আপত্তির মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় যুক্তি ও আইনি ব্যাখ্যাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে খবর।
অপরদিকে, ঋতব্রত শিবিরও অন্যান্য রাজ্যে ইউসিসি (West Bengal UCC Bill) কার্যকর হওয়ার অভিজ্ঞতা, বিরোধীদের উত্থাপিত প্রশ্ন এবং সম্ভাব্য সাংবিধানিক জটিলতা নিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা চালাচ্ছে। বিশেষত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে কী ধরনের রাজনৈতিক ও আইনগত অবস্থান নেওয়া হবে, তারও একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রায় প্রস্তুত বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
উল্লেখ্য, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মূল লক্ষ্য হল রাজ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও দত্তক গ্রহণ-সহ ব্যক্তিগত আইন সংক্রান্ত বিষয়ে অভিন্ন আইনি কাঠামো কার্যকর করা। তবে আদিবাসী সমাজকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। মুসলিমদের পাশাপাশি জৈন, শিখ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপর সম্ভাব্য প্রভাবও সরকার খতিয়ে দেখেছে বলে জানা গিয়েছে।
বিলটি পেশ হলে তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর এখনও পর্যন্ত বিধানসভার স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠিত হয়নি। সেই কারণে ইউসিসি বিলের খুঁটিনাটি পর্যালোচনার জন্য পৃথক বিশেষ কমিটি গঠনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, সেই কমিটির নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেই রাখা হতে পারে। যদিও সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত সোমবারই বিলটি বিধানসভায় উত্থাপিত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও রাজনৈতিক মহলে অনিশ্চয়তা ও কৌতূহল অব্যাহত রয়েছে।
