দেবোপম সরকার, কলকাতা: আধুনিক জীবনের জটিলতায় আমরা অনেক সময়ই দিশাহীন হয়ে পড়ি। প্রশ্ন জাগে পথ কোথায়? আলো কোথায়? আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, আমাদের আত্মার অন্তরতম প্রহরীতে রূপ নেন “গুরু”। ১০ জুলাই বৃহস্পতিবার অর্থাৎ আজ গুরুপূর্ণিমা। এই দিনটি কেবল একটি তিথি নয়, এক মহাজাগতিক সম্পর্কের স্মরণ, শ্রদ্ধা ও আত্মস্শুদ্ধির দিন।
গুরু মানেই আলোর দিশারী
‘গু’ মানে অন্ধকার, আর ‘রু’ মানে যা তা দূর করে। যিনি শিষ্যের অজ্ঞান ও অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন তিনিই গুরু। সনাতন ধর্মে আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনটি গুরুপূর্ণিমা নামে পরিচিত, কারণ এই দিনেই জন্মগ্রহণ করেন বেদব্যাস। তিনি চারটি বেদকে শ্রেণিবদ্ধ করে মানবজাতিকে জ্ঞানের পথ দেখিয়েছেন, তাই তাকে বলা হয় “ব্যাসদেব”। এদিন তার পূজা হয়, আর সেই সূত্রেই গুরুতত্ত্বকে স্মরণ করে গুরুপূর্ণিমা উদযাপন করা হয়।

গুরু: জন্ম থেকে আত্মার জাগরণ পর্যন্ত
জন্ম থেকেই জীবনের নানা পর্বে নানা রূপে গুরু আসেন- মা-বাবা, শিক্ষক, আচার্য, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। কিন্তু আধ্যাত্মিক গুরুদেব তিনি শুধুই কোনো মানুষ নন, তিনি আমাদের আত্মার জাগরণের মূল চাবিকাঠি।
গুরু-ভক্তি: আত্মিক সাধনার ভিত্তি
স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছিলেন, “Guru-Bhakti is the foundation of all spiritual development.”
এই ভক্তি সহজ নয়। আত্মিক শুদ্ধতা, প্রকৃত জ্ঞানপিপাসা ও অধ্যবসায়—এই তিনটি গুণ ছাড়া শিষ্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যায় না। গুরু নিজে থেকেই শিষ্য নির্বাচন করেন। তাই দীক্ষা নেওয়া নয়, দীক্ষা ‘পাওয়ার’ বিষয়। এ এক পরম কৃপা।
কৃপা ছাড়া সাধনা সফল নয়
শাস্ত্র, জপ, ধ্যান, পাঠ—সব কিছুই বৃথা যদি গুরুর কৃপা না থাকে। পরম পূজনীয় স্বামী ভূতেশানন্দজী বলেছিলেন, “গুরুর কৃপা হয় গুরুকে ভালবাসলে। আর ভালবাসা হয়, ভালবাসতে বাসতেই।” গুরু যখন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর রূপে ধরা দেন, তখন তাঁর প্রতি ভক্তি আর বিশ্বাসই হয় মুক্তির চাবিকাঠি। গুরুর আদেশ, তার দেখানো পথ অনুসরণ করে জপ-ধ্যানে স্থির থাকলে, ঈশ্বর প্রীতি একদিন ঠিকই আসবে।

গুরু শুধু ব্যক্তি নন তার মধ্যে বিরাজমান থাকেন ঠাকুর
রামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে গুরু নিজেকে কখনও ‘গুরু’ বলেন না। তাঁরা বলেন, “ঠাকুরই সব।” দীক্ষার সময় যে ব্যক্তি আপনাকে মন্ত্র দেন, তিনিও কেবল ঠাকুরের বাহক।
শেষ কথা: গুরুই আমাদের দ্বিতীয় জন্মদাতা
স্বামী বিবেকানন্দ সানফ্রান্সিসকোয় বলেছিলেন , “My first reverence is to the Guru… The Guru frees my soul…”
এই আত্মিক মুক্তিই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দরকার একান্ত গুরুভক্তি, কঠোর সাধনা ও হৃদয়স্থ বিশ্বাস।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:- https://youtube.com/@newspolebangla?si=mYrQvXTBQ1lG3NFT

আজ গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে গুরুদেব প্রণাম করার জন্য ভক্তদের ভিড় শুরু হয়। বেলুড় মঠের প্রেসিডেন্ট স্বামী গৌতমানন্দজী মহারাজ সহ ভাইস প্রেসিডেন্ট মহারাজ দের প্রণাম করতে আসেন ভক্তরা। অন্যদিকে কাঁকুড়গাছিতে যোগোদ্যান মঠের অধ্যক্ষ এবং বেলুড় মঠের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বামী বিমলাত্মানন্দজীকে প্রণাম করার জন্য ভক্তদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
সল্টলেকে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ কেন্দ্রে গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে বিশেষ পুজো এবং হোমের আয়োজন করা হয়। কেন্দ্রের সেক্রেটারি ডক্টর চঞ্চল দে জানান, গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে প্রতিবছর আমরা বিশেষ পুজোর আয়োজন করে থাকি এবং প্রায় হাজার খানেক ভক্ত প্রসাদ গ্রহন করে।

