বাংলার মানুষ হাসতে(laughing) ভুলে গেছে। বাঙালির দিন শুরু হয় কাঁধের ব্যাগে চিন্তার বোঝা নিয়ে, শেষ হয় মোবাইলের পর্দায় রীল স্ক্রল করে। হাসি? ওটা আজকাল এক বিলাসিতা। বাজারে ঢুকলেই দম বন্ধ হয়ে যায়—সবজির দামে হাসলে পকেট কেঁদে ওঠে। বৃষ্টি নামলেই হয় বন্যা, না নামলেই খরা। মাঝামাঝি কিছু থাকে না। বসন্ত ঋতু বিদায় নিয়েছে। এখন কেবল গরম কাল। ছয় ঋতুর হিসাবটা দাঁড়িয়েছে এই রকম– প্যাঁচপ্যাঁচে গরম, মাঝারি গরম, হালকা গরম, মাঝে মাঝে গরম, নেই গরম, আর ঠাণ্ডা-গরম। যেমন মাঝারি মেজাজের মুখও আজকাল দেখা যায় কম। কখনও বিদ্যুৎ যায়, কখনও ইন্টারনেট; সুখের সময় যায় কোথায়—মোবাইল রীলের মতোই, তিন সেকেন্ডে উধাও ! তাও নকলের বন্যায় বিরক্তি এনে দেয় বেশি। একসময় পাড়ার দোকানে গল্পের সঙ্গে চায়ের ধোঁয়া উঠত, এখন শুধু নোটিফিকেশনের শব্দ। কারোর মুখে কথা নেই। খালি আঙ্গুল নড়ছে মোবাইলের স্ক্রিনে। দশজনে বসে তিনটে চা চারজন মিলে ভাগ করে খাওয়া আর হাসির ফোয়ারা । হ্যাঁ, আমরা বাঙালিরা জল আর চা – দুটিই চলতি কথায় পানের বদলে খেয়ে ফেলি! এখন সে সব নির্মল হাসির দিন উধাও।
এরই মধ্যে বন্যা বিধ্বস্ত বাংলার পুজো পার্বণে একটু বাড়তি টাকার সংস্থান হলে বাঙালির মুখে স্বস্তির হাসি (laughing)এসে মনকে শান্ত করে। বাংলার পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তো হাসতেই জানতেন না। সাংবাদিক ফটোগ্রাফারদের ঘাম ছুটে যেত হাসির ছবি তুলতে । তা দেখে সহকর্মীদের মুখে হাসি ফোটে কিনা বলতে পারিনা! তবে এবছরের বন্যা বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গে কান্নার পরে একটু হাসির ঝলক দেখা যেতে পারে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী দাঁত চেপে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কেবল তিনিই বাংলার কথা ভাবেন– একটু দেঁতো হেসে সে কথা স্মরণ করিয়ে খুলে দেন দানের দরজা। ম্লান হাসি সহকারে সেই দান সোৎসাহে গ্রহণ করেন সব হারা মানুষের দল। খেয়াল করবেন, আমি খুব সচেতন ভাবে ‘সর্বহারা’ শব্দ ব্যবহার করলাম না। কারণ এই শব্দের অপব্যবহার করে সারা বিশ্বেই “যৌথ খামারের” এক সোনার পাথরবাটি আমদানি করেছিলেন ওই ব্যবসার কারবারিরা। ব্যবসা- কারণ বিনা শিক্ষায় এবং কুশিক্ষা নিয়ে যেভাবে রাজনীতির কারবারিরা ভারতবর্ষে অর্থনীতির ঘনীভুত রূপের দোকানদারের ভূমিকায় নিমেষে গাড়ি – বাড়ি আর ব্যাংক ব্যালেন্স বানিয়ে ফেলেন সেটা দেখলে শিক্ষিত মানুষরা নিজেদের বোকামিতে কাষ্ঠ হাসি উপহার দেন, নিজেকে। কারণ গৃহিণীর হাসির বদলে মুখের ঝামটা খেতে কজন মধ্যবিত্ত ভাল বাসেন। হাত তুলতে বললে একটা হাতই উপরে উঠবে। সেটা কার আপনি ভাবতে থাকুন।
[আরও পড়ুন] http://মেয়েরা তবে যাবে কোথায় ?
স্বদেশ যখন বিদেশী নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নাম করে জন্মভুমিতেই বিদেশী আচরণে মেতে ওঠে তখনও একটা হাসি পেতে পারেন। কষ্টের হাসি। কেননা বহু মানুষেরই স্বাধীনতার পরে ছিন্নমূলের সংসারে দলিল রেখে প্রমাণ করা খুবই শক্ত কাজ। এক সময় স্কুলে মাধ্যমিকের আগে জিজ্ঞাসা করা হত জন্ম তারিখ। অল্প লেখাপড়া জানা মায়ের স্মৃতি হাতড়ে যে দিনটা মনে হত, সেটাই হত ফাইনাল। সেই প্রজন্ম এখনও শেষ হয়ে যায়নি। একটা কথা না হেঁসেই বলা যায়, সিঁধেল চোর ধরা পড়ার ভয়ে আগেই গায়ে সরষের তেল মেখে চুরি করতে বের হয়। বুঝ মন যে জান সন্ধান।
তবে এই ভাবেই হাজার সমস্যার মাঝেই খুঁজে নিতে হবে হাসির রসদ। নাহলে শরীরে চিনি বেড়ে যাবে, রক্তচাপও বেড়ে যেতে পারে। শিশুর হাসি আর দাদুর হাসি- দুই অমুল্য এই সংসারে।(laughing therapy) অনেক কষ্টের হাসি বদলে যায় সাফল্যের রসায়নে।
হাসির(laughing) জন্য কেউ এখন রসিক বন্ধু খোঁজে না, খোঁজে ফিল্টার। তবু আশা থাকে—কখনও যদি আবার এই শহর একটু ধীরে চলে, যদি রোদে শুকনো জামার গন্ধের মতো একটা নির্ভেজাল হাসি ফেরে মুখে। কারণ, রাজনীতি থেকে রেশন—সব কিছুর দাম বাড়লেও হাসির দাম এখনও শূন্য। শুধু চাই ইচ্ছে। সেই আশাটাই বেঁচে থাক আর হেসে যাক প্রাণ।
