নিউজ পোল ব্যুরোঃ অর্থনীতি ও কূটনীতির দ্বিমাত্রিক নাটক আজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু করলেন এক গুরুত্বপূর্ণ এশিয়া সফর, যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য—একদিকে মিত্রতা জোরদার, অন্যদিকে তার সাম্প্রতিক কঠোর শুল্ক নীতির বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে প্রশমিত করা । ট্রাম্পের যাত্রাপথে রয়েছে মালয়েশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া — যেখানে তিনি অংশ নেবেন আসিয়ান (ASEAN) সম্মেলন ও এপেক (APEC) শীর্ষ বৈঠকে। তবে এই সফরে যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছায়ার মতো উপস্থিত, তা হলো নতুন করে শুরু হওয়া তার শুল্ক যুদ্ধের (Trade Tour)বিস্ফোরণ।
শুল্ক নীতির(Trade Tour)সাম্প্রতিক মোড় – অক্টোবরের মাঝামাঝি ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করেছে চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, যা বর্তমানে কার্যকর ৩০ শতাংশের ওপর সংযোজিত হবে এবং নভেম্বর ১ তারিখ থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । একইসঙ্গে, জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে তিনি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছেন ভারী ট্রাক, বাস ও তাদের যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর । বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াবে এবং বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, অফশোর উৎপাদনের কারণে মার্কিন নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাই দেশীয় উৎপাদন ফিরিয়ে আনা দরকার । কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মত, এই ‘আমেরিকা-প্রথম’ নীতি বাস্তবে বিশ্ব বাণিজ্যিক সরবরাহ শৃঙ্খল(chain) ব্যাহত করছে, বিশেষত প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য খাতে ।
[আরও পড়ুন] http://রাজারহাটে তাপস দাদার ব্যতিক্রমী ভাইফোঁটা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্বেগ ও প্রভাব – ট্রাম্পের শুল্ক বাড়ানোর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে । মার্কিন বাজারে চীনা পণ্যের বিকল্প হিসেবে এই অঞ্চলের দেশগুলো যে সুযোগ পেয়েছিল, তা এখন বিপরীত দিকে যাচ্ছে। কারণ মার্কিন প্রশাসন ট্রান্সশিপমেন্ট বা তৃতীয় দেশ হয়ে রপ্তানি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে । যার ফলে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামসহ বহু দেশের কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই ও বিনিয়োগ হ্রাসের ইঙ্গিত মিলছে।
এশিয়া সফরের কূটনৈতিক বার্তা- এই সফরে ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুই মেরুর মধ্যে চাপা কূটনৈতিক সংঘাত শান্ত করা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকার উপস্থিতি জোরদার করা । টোকিওতে জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এবং বুসানে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়াতেই সাক্ষাৎ করবেন । এই আলোচনাকালীন সময়েই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন কোনো ছাড়ের ইঙ্গিত দিতে পারে কিনা, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক বাজারের নজরদারিতে রয়েছে।
সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে ট্রাম্পের শুল্কনীতি যেন এক দুমুখো তলোয়ার । দেশীয় রাজনৈতিক সমর্থন জোগায়, কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। ২০২৫ সালের শেষার্ধে যখন বিশ্বের বহু অর্থনীতি কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি ও সরবরাহ সীমাবদ্ধতার মুখে, তখন আমেরিকার এই সুরক্ষাবাদী নীতি শুধু চীন নয়, গোটা এশিয়া ও এমনকি মিত্র দেশগুলিকেও অর্থনৈতিক ধাক্কা দিচ্ছে। তিনি আজ যাত্রা শুরু করছেন এমন এক অঞ্চলে, যেখানে আমেরিকার প্রভাব নড়িয়ে দিচ্ছে বেইজিংয়ের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দাপট । ট্রাম্পের বক্তব্য যতই আপাত নিরপেক্ষ মোড়কে পেশ করা হোক না কেন, এর অন্তর্নিহিত সুর – “আমার শর্তেই হবে বাণিজ্য”। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর এশিয়া সফর এক দ্বন্দ্বময় নাটক – একদিকে শুল্কের ধাক্কা, অন্যদিকে শান্তির অভিনয় । এশিয়া এই সফর থেকে কতটা সমঝোতা পাবে, তা সময়ই বলবে, কিন্তু একথা নিশ্চিত—ট্রাম্প আবার সেই প্রাক্তন বিশ্ব বাণিজ্যিক অর্থনীতির ক্লাইম্যাক্সের জন্য নতুন করে দৃশ্য লিখতে শুরু করেছেন । যেখানে ভারতের কাজ হবে, দেখ আর সাবধান হও। এই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ থিওরি ভারতের রক্ষাকবচ।
