Editorial: ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে রাজনীতির তামাশা

সম্পাদকীয়

    উত্তরবঙ্গের(North Bengal) সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় আবারও আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিল, দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কতটা নগ্ন এবং ঠুনকো রয়ে গেল এই দেশের রাজনীতি। একদিকে হাজার হাজার মানুষ, সতেজ প্রাণ ও স্বপ্ন ধ্বংসস্তূপে পিষ্ট। অন্যদিকে, সেই মৃত্যুর শোককে ঘিরে মিডিয়া ক্যামেরার সামনে চলছে দায়িত্বজ্ঞাপক ‘দয়া ও দায়বোধে’র প্রতিযোগিতা। নেতাদের “উদ্ধার রাজনীতি” ও বাস্তব দৃশ্য। উত্তরবঙ্গের রাস্তায় আজ শুধু কাদা, পানি আর কান্না। অথচ সেই একই মাটির ওপর প্রধানমন্ত্রীর ‘বড়সড়’ আশ্বাস আর মুখ্যমন্ত্রীর ‘দায়িত্ববান’ বক্তৃতা চলতে থাকে রোজ মোড়ে মোড়ে। কেন্দ্র আর রাজ্যের মধ্যে কাকে বেশি দোষী প্রমাণ করা যায়, কার ত্রাণ প্যাকেট কম/বেশি পৌঁছালো, কাকে দিস্তে দিস্তে দায় চাপানো যায়— এই নিয়েই যেন চলছে খ্যাপা মাদারির খেলা। প্রশাসনিক তৎপরতার নাম করে অনর্থক সফর আর হেলিকপ্টার শো— যেন একটি ভ্রাম্যমাণ বিপণি, যেখানে প্রতিটি ত্রাণ প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে, “আমরা দিলাম!”দোষারোপ, তর্জনী, ও “রিং” রাজনীতি – “ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে রাজনীতির তামাশা”—এই বাক্যটিই এই দুঃসময়ের জন্য সবচেয়ে যথাযথ। বিপর্যয় থেকে উদ্ধার-কার্য প্রতিনিয়ত ডুবে যাচ্ছে একে-অপরকে দোষারোপ করার কাঁদা ছোঁড়াছুড়িতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি বলেন , “রাজ্য থমকে গেছে, পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।” মুখ্যমন্ত্রী বলে উঠছেন, “কেন্দ্রীয় বরাদ্দ কম, ঢিলেমি করেছো তোমরা।” সংবাদ সম্মেলন আর টুইটার, দু’দিক থেকেই ঝরে পড়ছে ‘তর্জনী’র শাসানি — কে কার ওপরে বেশি দায় চাপাতে পারেন তার লড়াই চলছে অনর্থক এবং নিরন্তর। বিপর্যয়ে রাজনীতির এই কুৎসিত মুখ মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণায় যেন আরও গভীর ক্লান্তি এনে দেয়।

[আরও পড়ুন] http://উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারি দায়িত্ব
মাদারির খেলা : সিস্টেম বনাম করুণ বাস্তবতা– পুরো ব্যবস্থাটা যেন এক “মাদারি খেলা”—হতবাক জনতাকে গল্প শোনানোর খেলোয়াড় রাজনীতিকরা নিজেরাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন বাহবা কুড়াতে। প্রকৃত দুর্ভোগে থাকা মানুষের কষ্ট নিয়ে নয়, বরং মিডিয়ায় কার ছবি বড়— সেটাই হল আসল লড়াই। জল, খাবার, ওষুধের বদলে আসে প্রতিশ্রুতির বন্যা, হাতে হাতে ফুটেজ বিলিয়ে দৃশ্যতই ঘটে ‘উদ্ধার’। অথচ বাস্তবতায়, মৃত্যু আর করুণার লেলিহান আগুনে ভস্মীভূত হচ্ছে রাজনীতি ও মানুষের সম্পর্ক।
উপসংহার : ধ্বংসস্তূপে নতুন সমাজবোধের ডাকের সময় এসেছে। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নতুন কিছু ভাবার। রাজনীতি যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তবে সেখানে দেখনদারির, শাসানোর, দোষারোপের, মাদারির খেলা চলার কোনও মানে নেই। দরকার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সহযোগিতামূলক মনোভাব, আর দুর্যোগ-কবলিত মানুষের প্রতি মানবিক হস্তক্ষেপ। নইলে উত্তরবঙ্গের (North Bengal)কালো মেঘের পাশে এই “রাজনীতির রিং” চিরকালই বয়ে চলবে, আর হাজারো মৃত্যু—শুধু ভোটের ক্যালকুলেশনেই আটকে থেকে যাবে। সাম্প্রতিক টিভি ও মুদ্রণ ক্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক সংবাদ ,সরকারি বিবৃতি আর সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষণ থেকে এই বোধই রয়ে যায়। গেঁথে যায় মনের গভীরে।