Editorial: উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতিতে সরকারি দায়িত্ব

সম্পাদকীয়

 

উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ বন্যা (North Bengal Flood) পরিস্থিতি বর্তমানে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক প্রস্তুতি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও অবকাঠামোগত বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষা। কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টিতে নদ-নদীর জলধারা ভয়াবহভাবে ফুলে উঠেছে, ভেসে গেছে গ্রামীণ সেতু, রাস্তাঘাট, ফসলের জমি ও মানুষদের ঘরবাড়ি। বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অনেকে, জলের স্রোতে হারিয়ে গেছেন অনেকে। হাজারো পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের ভূমিকা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বন্যা প্রতিরোধে আগে থেকে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা ও বন্যাপ্রবণ এলাকার (North Bengal Flood) জরুরি তালিকা তৈরি করা ছিল প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় সঠিক সংকেত, ত্রাণ পৌঁছানো ও উদ্ধারকাজের সমন্বয় আশানুরূপ হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনের খবরের অভাব ও কেন্দ্রীয়ভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি জনগণের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ।

[আরও পড়ুন] http://কাফ সিরাপ খেয়ে শিশুর মৃত্যু ও দায়িত্ব
দ্বিতীয়ত, ত্রাণ কার্যক্রম কেবল খাদ্য, ওষুধ ও পানীয় জল বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও ফসল পুনরুদ্ধার প্রকল্প দ্রুত কার্যকর করতে হবে।(North Bengal Flood) দীর্ঘমেয়াদে বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, ড্রেনেজ সংস্কার এবং জলধারা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ অপরিহার্য। এই বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ বাজেটের অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া মানে প্রতি বছর একই দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই সময় প্রতিহিংসা বা দায় চাপানোর খেলায় না গিয়ে একসঙ্গে কাজ করা। দুর্যোগ নিরসন কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানবিক দায়িত্ব।(North Bengal Flood) বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকা রাজ্যের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার। আশার কথা, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই নির্ধারিত কাজকর্ম স্থগিত রেখে রওনা দিয়েছেন উত্তরবঙ্গে। রাজ্যপালের উদ্যোগেও খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম আর হেল্প লাইন। কিছুদিন আগেই উত্তর ২৪ পরগণার সন্দেশখালিতে যেরকম আশু উদ্যোগ নিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা করা হয়েছে। সেই সাধুবাদ ধরে রাখতে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রেও। একইসঙ্গে উল্লেখের দাবি রাখে নেপাল ও ভুটানের – পাশের এই দুটি দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সঙ্গতভাবেই কেন্দ্রের সাহায্যের আশ্বাস যেমন ভাবে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। একই রকমভাবে এই রাজ্যের বিপদকেও জাতীয় বিপর্যয় ধরে বাড়িয়ে দিতে হবে সাহায্যের পরিমাণ। সবশেষে, সরকারকে বুঝতে হবে যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী নীতি। জনগণ কর দিয়ে প্রশাসনিক যন্ত্র চালায়, আর সেই যন্ত্রের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে জনগণকে নিরাপদ রাখা। উত্তরবঙ্গের এই বেদনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দুর্বল অবকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।এই মুহূর্তে জরুরি হচ্ছে শুধু উদ্ধার নয়, বরং এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন কাঠামো গড়া যা পরবর্তী প্রজন্মকে একই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। প্রশ্ন একটাই—রাজ্য সরকার কি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, নাকি আবারও জনগণের আস্থাকে ভাসিয়ে দেবে বন্যার জলে?