নিউজ পোল ব্যুরো:দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও সতীর্থকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। প্রশাসনিক ক্ষমতায় আসার পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাঁকে আস্থার সঙ্গে সামনের সারিতে রেখেছিলেন, সেই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Asish Banerjee Death) আকস্মিক মৃত্যুতে স্তব্ধ তৃণমূল নেত্রী। পাঁচবারের বিধায়ক, প্রাক্তন রাজ্যের মন্ত্রী এবং বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক গুরুদায়িত্ব সামলানো ৭৫ বছর বয়সি এই প্রবীণ রাজনীতিকের প্রয়াণে রবিবার শোকের আবহ নেমে আসে বঙ্গের রাজনৈতিক মহলে।
যদিও ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাটে পরাজয়ের পর রাজনৈতিক শিবির বদল করেছিলেন প্রাক্তন বিধায়ক, তবুও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের সূত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সঙ্গে তাঁর আত্মিক যোগাযোগ অটুট ছিল বলেই দাবি তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুসংবাদে গভীরভাবে বিচলিত মুখ্যমন্ত্রী বিকেলে সামাজিক মাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে এই মৃত্যুকে কার্যত ‘রাজনীতির বিষ’-এর পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পোস্টে লেখেন, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে। জীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করার পাশাপাশি ‘মাটির মানুষ’ হিসেবে রামপুরহাট তথা বীরভূমে তাঁর পরিচিতি ছিল। পাঁচবারের বিধায়ক এবং প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে রামপুরহাটের উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
তবে রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্বে তাঁকে বারবার হেনস্তা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ মমতার। বিশেষ করে শেষ জীবনে তাঁর উপর প্রবল মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের তাৎপর্যপূর্ণ অংশে উঠে এসেছে ‘রাজনীতির বিষ’-এর প্রসঙ্গ। তাঁর কথায়, রাজনীতির বিষ কীভাবে ধীরে ধীরে একজন মানুষকে নিঃশেষ করে দিতে পারে, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু যেন তারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ।
উল্লেখ্য, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বীরভূমে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন দেখা গেলেও রামপুরহাট আসনটি ধরে রাখার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরই ভরসা রেখেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফলে সেই আস্থা সফল হয়নি। রামপুরহাট আসনে জয় পান বিজেপির জেলা সভাপতি ধ্রুব সাহা।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:https://youtube.com/@thenewspole
নির্বাচনে পরাজয়ের পর কলকাতায় ফেরার পথে বর্ধমানের কাছে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভের অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় বিজেপির নাম জড়ালেও অভিযোগগুলি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়। অভিযোগ, তাঁকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিকর মন্তব্য করা হয়েছিল এবং গত ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে আক্রমণ করা হয়। এমনকি বিজেপির এক মণ্ডল সভাপতির বিরুদ্ধে বয়সের কারণে তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শোকবার্তায় যে ‘হেনস্তা’, ‘অপমান’ এবং ‘মানসিক চাপ’-এর কথা উঠে এসেছে, রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তা নির্বাচনের পর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া এই ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের দিকেই ইঙ্গিতপূর্ণ। যদিও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক চাপের কোনও প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার এক প্রান্তে এসে শিবির বদল করলেও আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্ক যে সম্পূর্ণ মুছে যায়নি, মুখ্যমন্ত্রীর আবেগঘন শোকবার্তায় তারই প্রতিফলন দেখা গেল। তাঁর প্রয়াণে একদিকে যেমন প্রবীণ এক রাজনীতিকের অধ্যায়ের অবসান ঘটল, তেমনই সামনে এল রাজনীতির তীব্র প্রতিকূলতা ও ব্যক্তিগত জীবনে তার অভিঘাত নিয়েও এক নতুন বিতর্ক।
