নিউজ পোল ব্যুরো: নিশ্ছিদ্র ঐশ্বরিক পরিকল্পনার মতোই কেটেছিল তার জীবনের শেষ দিনটি। ঠিক আজকের দিনেই, ৪ঠা জুলাই ১৯০২, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মহাসমাধিতে লীন হয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)। এই দিনটি ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস আর সেই দিনই তিনি বেছে নিয়েছিলেন তার ‘মুক্তি’র দিন হিসেবে।
আরও পড়ুন:Adah Sharma: চোট পেয়েও শ্যুটিং চালিয়ে গেলেন ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ খ্যাত আদাহ!
ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে ধ্যানমগ্ন হলেন বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda)। মনে পড়ল মায়ের মুখ, বুকভরা ব্যথা ছাপিয়ে এল এক অদ্ভুত আনন্দ। মনে হল, শরীরের সব রোগ সারিয়ে যেন এক নতুন শক্তিতে জেগে উঠেছেন তিনি। তাঁর মনে আর কোনও অশান্তি নেই। শান্ত, স্নিগ্ধ হয়ে আছে তাঁর অন্তর। সকাল সাড়ে আটটায় প্রেমানন্দকে ডেকে বললেন ধ্যানের জন্য ঠাকুরের শয়নঘরে আসন পাততে। জানলা-দরজা বন্ধ করে শুরু হল দীর্ঘ ধ্যান। বেলা ১১টায় ধ্যান ভেঙে বেরিয়ে এলেন সুরে সুরে “মা কি আমার কালো, কালোরূপা এলোকেশী, হৃদিপদ্ম করে আলো…” গাইলেন এই গান। তারপর গুরুভাইদের সঙ্গে তৃপ্তি করে খেতে বসেন ইলিশের নানা পদ। জানতেন, এবার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই শরীর নিয়ে আর কোনও বিধিনিষেধ মানার প্রয়োজন বোধ করেননি। তরুন সন্ন্যাসীর রূপের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে গুরুভাইরা।
দুপুরে ব্যাকরণের ক্লাসে মেতে উঠলেন তিনি। পাণিনির সূত্রকে মজার গল্পে বেঁধে দিলেন ব্রহ্মচারীদের জন্য। বিকেলে দুই মাইল হাঁটলেন বেলুড় বাজার অবধি। সন্ধ্যায় গঙ্গার ধারে আমগাছের তলায় আড্ডা, তামাক, চা সব মিলিয়ে যেন অনন্য এক বিদায়ের সাজ। এতটা হাঁটা তাঁর শরীর ইদানিং নিতে পারছে না। কিন্তু ১৯০২ এর ৪ ঠা জুলাইয়ের গল্প অন্যরকম। কোনও কষ্টই আজ আর অনুভব করলেন না। বুকে এতটুকু হাঁফ ধরল না। আজ তিনি অক্লেশে হাঁটলেন। তিনি জানতেন, আর মাত্র কয়েকঘন্টার পথ তাঁকে পেরোতে হবে। ডাক্তারের উপদেশ মেনে চলার আর প্রয়োজন নেই। জীবনের শেষ দিনটা তো আনন্দেই কাটানো উচিত।
সন্ধে সাতটায় আরতি শুরু হতেই নিজের কক্ষে ফিরে গেলেন। স্বামীজি (Swami Vivekananda) জানতেন আর দেরি করা চলবে না। শরীরটাকে জীর্ন বস্ত্রের মতো ত্যাগ করার পরমলগ্ন এগিয়ে আসছে। ব্রজেন্দ্রকে বললেন বাইরে বসে জপ করতে। আর বললেন “আমাকে দুছড়া মালা দিয়ে তুই বাইরে বসে জপ কর। আমি না ডাকলে আসবি না।” দরজা বন্ধ করে বসে পড়লেন চিরন্তন ধ্যানে। স্বামীজি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে এটাই তাঁর শেষ ধ্যান।
ঠিক রাত ৯টা ১০ মিনিটে শুয়ে থাকা অবস্থায় হালকা কেঁপে উঠল তাঁর শরীর। চোখ, ঠোঁট ও নাকের কোণ থেকে বেরোল রক্ত। কুন্ডলিনীর শেষ ছোবল বুঝতে পারলেন বিবেকানন্দ। শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন তিনি। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাথাটা নড়ে উঠেই বালিশ থেকে পড়ে গেল। ঠোঁট আর নাকের কোনে রক্তের ফোঁটা। দিব্যজ্যোতিতে উজ্জ্বল তাঁর মুখ। ঠোঁটে কোনায় হালকা হাসি, চলে গেলেন ঠিক রাত নটা দশ মিনিট এ!
ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন , “তুই যেদিন নিজেকে চিনতে পারবি সেদিন তোর এই দেহ আর থাকবে না।” স্বামীজি, শ্রী রামকৃষ্ণদেবকে (Ramakrishna Paramhans) বলেছিলেন, তাঁর চল্লিশ পেরোবে না। বয়েস ঠিক উনচল্লিশ বছর পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন।
পরদিন, ৫ই জুলাই ভোরবেলা, ফুলে-ঢাকা গালিচায় শায়িত রইলেন দিব্যরূপে। তাঁর প্রসারিত ডান হাতের আঙুলে জড়িয়ে আছে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি। তাঁর চোখদুটি যেন ধ্যানমগ্ন শিবের চোখ‚ অর্ধনিমীলিত‚ অন্তর্মুখী‚ অক্ষি-তারা। বিবেকানন্দের দেহ স্থাপন করা হল চন্দন কাঠের চিতায়। পাশে বসে অশ্রুসিক্ত চোখে বাতাস করছিলেন নিবেদিতা স্বামীজির পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে অনবরত বাতাস করছেন। তাঁর দুটি গাল বেয়ে নামছে নীরব অজস্র অশ্রুধারা। স্বামীজির মাথা পশ্চিম দিকে। পা-দুখানি পুবে‚ গঙ্গার দিকে। নিবেদিতা মনে মনে ভাবলেন “প্রভুর ওই জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ডের এক টুকরো যদি পেতাম!”
৫ ই জুলাই দাহকার্য সম্পন্ন হয়েছিল। আর নিবেদিতা (Nivedita) অনুভব করেছিলেন‚ কে যেন তাঁর জামার হাতায় টান দিল। তিনি চোখ নামিয়ে দেখলেন‚ অগ্নি ও অঙ্গার থেকে অনেক দূরে‚ ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি‚ সেখানেই উড়ে এসে পড়ল ততটুকু জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ড যতটুকু তিনি প্রার্থনা করেছিলেন। নিবেদিতার মনে হল‚ মহাসমাধির ওপার থেকে উড়ে আসা এই বহ্নিমান পবিত্র বস্ত্রখণ্ড তাঁর প্রভুর‚ তাঁর প্রাণসখার শেষ চিঠি। আজও ৪ঠা জুলাই মানেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ সেই মহামানবের যিনি জীবনের শেষ দিনটিকেও করলেন অধ্যাত্ম আর আনন্দের নিটোল ছন্দে পূর্ণ।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:- https://youtube.com/@newspolebangla?si=mYrQvXTBQ1lG3NFT
