Editorial : বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে ছবিটা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

সম্পাদকীয়

বুর্জোয়া ছাপ দিয়ে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার (Education System)বিরুদ্ধে ৭০ দশকে ভয়াবহ ঝোঁক দেখা দিয়েছিল। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তারপরে ক্ষমতার বদল ঘটল। এল বামপন্থীরা। তারা প্রথমে সহজপাঠ তুলে, ইংরেজি শিক্ষা(English)তুলে দিয়ে একটা যাচ্ছেতাই শিক্ষা মডেল বাংলার বুকে চালানোর বিফল চেষ্টা করেছিল। ৩৪ বছরের অপশাসনকে পুঁজি করে দিনকে সামনে রেখে ফের ক্ষমতার হাতবদল হল। এবার যারা এল তারা নিজেরাই একটা যাচ্ছেতাই অনভিজ্ঞ দল। ফলে এবার বই খাতা, শিক্ষক,শিক্ষাব্যবস্থা,শিক্ষাঙ্গন– সব কিছুর মধ্যেই বোধহয় শুধুমাত্র ব্যবসা ক্ষেত্রের পরিসর খুঁজে পেলেন। দলীয় দাদাগিরি,শিক্ষক পেটাও, আর শিক্ষকের চাকরি বেচাকেনার এক মুক্ত বাণিজ্যকেন্দ্র বানিয়ে তোলা হল। অথচ এই স্বল্প সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার আধুনিকীকরণ — সবই একটা প্রগতির দিকে যাচ্ছিল মুখ্যমন্ত্রীর প্রচেষ্টায়। পোশাক ও সাইকেল দেওয়া, স্কুলের ছাত্রছাত্রীর জন্য বিভিন্ন প্রকল্প- বেশ একটা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলার ছেলেমেয়েদের মেরুদণ্ড টানটান করে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করছিল। সেই উত্থানের হাউই সশব্দে ফেটে গেল নিয়োগ দুর্নীতির সামনে।
দ্বিতীয়ত, অপরাধ প্রবণতা ও রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে কলুষিত করছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি এখন পড়াশোনার জায়গায় দাঙ্গা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর টেন্ডারবাজির আসর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকরা অনেক সময় চাপের মুখে স্বাধীনভাবে পড়াতে পারছেন না।
তৃতীয়ত, অর্থলোলুপতা ও বাণিজ্যিকরণ শিক্ষাকে (Education System)একেবারে বাজারে পরিণত করেছে। কোচিং সেন্টার, টাকার বিনিময়ে পাশ করানো, নকলচক্র—এসব বাংলার শিক্ষার মানকে ধ্বংস করছে। ফলে গরিব ছাত্ররা আরও পিছিয়ে যাচ্ছে, আর ধনী পরিবারগুলির হাতে সুযোগ জমা হচ্ছে।
অবশেষে, এসব দুর্নীতি ও অপরাধ প্রবণতা মিলে শিক্ষা থেকে সরে যাচ্ছে নৈতিকতা ও মানবিকতা। তৈরি হচ্ছে এমন এক প্রজন্ম, যাদের মেধা নয়, চাতুরী ও অসততা দিয়ে বাঁচতে শিখতে হচ্ছে। তাই বলা যায়, বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা আলোর বদলে এক অন্ধকার জাহান্নামে ঢুকে পড়ছে। যে ভয়ংকর অভিযোগ সামনে উঠে আসছে তাকে একটু বিশদে ব্যাখ্যা করা যাক।
[আরও পড়ুন] http://গুগল সার্চ: তথ্য খোঁজার নির্ভরযোগ্য সম্রাট
২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।(Education Scenario)
আদালতের নির্দেশে প্রায় ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীর চাকরি বাতিল হয়—এটি দেশের মধ্যে নজিরবিহীন।
শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রাথমিক নিয়োগের দুর্নীতির জেরে একাধিক মন্ত্রী ও নেতা গ্রেফতার হন; তদন্ত এখনও চলছে।
শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ বেড়ে চলেছে; ২০২৫ সালেও একাধিক ক্যাম্পাসে ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গে নাবালকদের (ছেলে-মেয়ে) বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় রাজ্যটি ২০২১ সালে দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে ছিল। ২০২১ সালে নাবালকদের উপর ৯,৫২৩টি অপরাধের মামলা হয়, যার মধ্যে অধিকাংশ অপহরণ ও যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮-২০২২ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এসবই নিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে নানা আইন এবং তদন্ত চালু হয়েছে, যেমন ২০২৪ সালের অপরাজিতা বিল। দুর্নীতির তদন্তে সিবিআই ও ইডি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। তবু আত্মতুষ্টির জায়গা খুঁজে পাওয়ার অবকাশ নেই। সার্বিকভাবে, শিক্ষা ক্ষেত্রের উপর এই অপরাধ ও অনিয়ম ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, অবিভাবক ও সমাজের জন্যই গভীর সংকটের বার্তা বহন করছে। প্রকৃত শিক্ষা ও দুর্নীতি মুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি সোনার পাথরবাটি হয়ে পড়ে। তাহলে জেন জে থেকে আলফা,বিটা- সবাই বাংলাকে নিয়ে যাবে বাসের কন্ডাকটরের মত –দয়া করে পিছনের দিকে এগিয়ে যান।