নিউজ পোল ব্যুরোঃ ভাইফোঁটা (Bhaiphonta) বাঙালির একটি প্রাচীন পারিবারিক ও ধর্মীয় উৎসব, যার ইতিহাসে একাধিক পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক সূত্র জড়িয়ে আছে । এটি কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে পালিত হয়, যখন বোনেরা ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেন তার দীর্ঘজীবন ও সুখ-সমৃদ্ধি কামনায়। এই দিনটিকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে “ভ্রাতৃদ্বিতীয়া”, “ভাইদুজ” বা “ভাইটিকা” নামেও পরিচিত ।
পৌরাণিক উৎপত্তিঃ ভাইফোঁটার (Bhaiphonta) সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনি মৃত্যুর দেবতা যম ও তাঁর বোন যমুনাকে ঘিরে । পুরাণে বর্ণিত আছে, যমুনা বহুবার তাঁর ভাইকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেও যম আসতে পারেননি। অবশেষে একদিন, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে যম যমুনার বাড়িতে আসেন, যমুনা আনন্দে তাঁর কপালে ফোঁটা দেন ও ভোজন করান। যম খুশি হয়ে বর দেন যে, এই দিনে যে ভাই নিজ বোনের হাতে ফোঁটা নেবে, তার অকালমৃত্যুর আশঙ্কা থাকবে না । আরেকটি প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে শ্রীকৃষ্ণ ও সুভদ্রার গল্পে। নরকাসুর বধের পর কৃষ্ণ ফিরে এলে, তাঁর বোন সুভদ্রা কপালে তিলক লাগিয়ে তাঁকে ফুল ও মিষ্টি দিয়ে বরণ করেন। অনেকেই মনে করেন এই সৌভ্রাতৃত্বের মুহূর্ত থেকেই ভাইফোঁটার সূচনা ।
[আরও পড়ুন] http://পেনশন সরলীকরণ – একটি সমালোচনা ও বিশ্লেষণ।
জৈন সূত্রের ব্যাখ্যাঃ জৈন দর্শনের প্রাচীন গ্রন্থ ‘দীপোৎসবকল্প’-এর বর্ণনায় মহাবীরের মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামী নন্দীবর্ধন ও বোন অনসূয়ার ঘটনা থেকে এই উৎসবের আরেকটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় । মহাবীরের প্রয়াণে দুঃখে নন্দীবর্ধন অনশন ধরলে, বোন অনসূয়া এক কার্তিক শুক্ল দ্বিতীয়া তিথিতে তাঁকে আহার দেন ও মানসিকভাবে ফিরিয়ে আনেন — এই ঘটনাকেও ভাইফোঁটার সূচনা বলে অনেকেই মনে করেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যঃ কালক্রমে ভাইফোঁটা ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে পারিবারিক সম্প্রীতির উৎসব হয়ে উঠেছে । শুধু সহোদর ভাই-বোন নয়, সমাজে আত্মীয়তা ও মমতার বন্ধনকে দৃঢ় করাই এর লক্ষ্য। আজও গ্রাম থেকে শহরজুড়ে এই দিনে বোনেরা ফোঁটা দেন, ভাই প্রতিজ্ঞা করেন রক্ষার, আর পারস্পরিক ভালবাসায় আলোকিত হয় বাঙালি পারিবারিক জীবন।
ভাইফোঁটা তাই শুধু এক দিনের আচরণ নয়, এটি বোনের আশীর্বাদ ও ভাইয়ের প্রতিশ্রুতির প্রতীক। চন্দনের ফোঁটা সূর্যের প্রতীক। যমের একেবারে বিপরীত ধর্মী। মোটের উপর এই প্রচলনের যে সামাজিক ভ্যালু অনেক বেশি সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বর্তমানে এই দিনে একে অপরকে উপহার দেওয়ার প্রচলন আছে। যমুনা, সুভদ্রা কিংবা অনসূয়ার কাহিনি যাই হোক না কেন, এই উৎসবের মর্ম একটাই—ভালোবাসা, রক্ষা ও ঐক্যের বন্ধনে পরিবারকে দৃঢ় করে রাখা ।
