শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়:
চলচ্চিত্র: OCD (ওসিডি)
পরিচালনা: সৌকর্য ঘোষাল
অভিনয়ে: জয়া আহসান, আর্শিয়া, কৌশিক সেন, শ্রেয়া ভট্টাচার্য, কনীনিকা ও অনসূয়া মজুমদার
নিউজপোল বাংলা রেটিং ৮/১০
ছবি যখন সমাজ সংস্কারক হয়ে ওঠে, তখন সে ছবি ইতিহাস তৈরি করে। তেমনই এক ছবি সৌকর্য ঘোষালের ‘ওসিডি’। সমাজের সর্ষের ভিতর ভূতদের বার করে আনল ‘ওসিডি’। পরিচালক পর্দায় ‘OCD‘ লেখেন নায়িকার হাত দিয়ে চাঁদের কলঙ্ক মোছার মতো করেই। কিন্তু জীবনে যদি পড়ে কলঙ্কের দাগ?
যখন বিশ্ব রাজনীতিতে ঝড় তুলছে ‘এপস্টিন ফাইলস’ সেই দোলাচল সময়ে সমাজের গোপন অপরাধের আগল ভাঙল এই ছবি। ‘ওসিডি‘ আর ‘পিডোফিলিয়া’ বিষয়ে বিস্তারিত বাংলা ছবি এই প্রথম। পারিবারিক যৌন হেনস্থা বা কাছের মানুষদের দ্বারা শিশুদের যৌন হেনস্থা তো বহু পরিবারেই ঘটে থাকে। অথচ সে সত্যি কখনও সামনে আসে না। আর সমাজের একদল বিকৃতকামীর হেনস্থার শিকার হয়ে কত নাবালক, নাবালিকার শৈশব হয়ে যায় ক্ষতময়। যুগে যুগে হয়ে আসা নিষিদ্ধ অপরাধ এই প্রথম উঠে এল পর্দায়।
‘ওসিডি’ চলচ্চিত্রের সবথেকে মন কাড়া দৃশ্যটি দিয়েই ছবির বিশ্লেষণ শুরু করি। মধ্য রাতে দুটি বাচ্চা উঠোনে বসে গল্প করছে। তারা আদতে সৎ ভাইবোন। একজনের মা নেই, অন্যজনের বাবা নেই। অথচ যে বাবা-মা জীবিত তারা তখন রমনলীলায় ব্যস্ত। এ হেন পরিস্থিতিতে সৎ ভাইবোন একে ওপরের অবলম্বন হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের শৈশব শেষ করে দিতে আসে বাড়িওয়ালা ‘ভাল কাকু’। নামের মহিমা, কাকুর চরিত্রে নেই। এই ‘ভাল কাকু’র বিকৃতকামের থেকে রেহাই পায় না শিশু দুটি। শিশুদের যৌন নির্যাতন করে মজা পাওয়া এক বিকৃত ব্যধি। ‘মিটু’ নিয়ে কথা বলা হলেও পিডোফিলিয়া’ নিয়ে আলোচনা হয় না। ফলতঃ শৈশবের ক্ষত জীবনভর বয়ে বেড়াতে হয়।
তেমনই ছবির মূল চরিত্র শ্বেতা। যে ভূমিকায় জয়া আহসান। শ্বেতা এই ছবির সূত্রধর। তাঁর মুখ দিয়েই ছবির গল্প শুরু হয়। তাঁর অতীতের রক্তাক্ত স্মৃতি তাঁকে করে ফেলেছে এক ‘ওসিডি’ রোগী। ছোট্ট মেয়েটিকে তাঁর ঠাম্মা শিখিয়েছিলেন ‘শরীর নোংরা হলে মনটাও নোংরা হয়ে যায়! স্নান করে ফেলো।’ সেই এক শেখানো বাণী মেয়েটি তার ভাইকেও শিখিয়েছিল। নোংরা মনের লোকদের থেকে বাঁচতে। তবে এই কথা এ যুগের ছেলেমেয়েরা কতটা সমর্থন করবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
এমন সাইকোলজিকাল ডার্ক থ্রিলার বাংলা ছবি করে চমকে দিলেন সৌকর্য ঘোষাল। তাঁর প্রথম ছবি ‘রেনবো জেলি’ শুরুতেই আশা জাগিয়েছিল। জয়ার সঙ্গে সৌকর্যর ‘ভূতপরী’-ও প্রশংসিত হয়। কিন্তু এবার ছোটদের ছবি ছেড়ে ছোটদের কথা বলেই বড়দের ছবি বানিয়েছেন পরিচালক। রক্ত, যৌনতা থেকে প্রতিহিংসা আর সবশেষে পাপমুক্ত পৃথিবী এ ছবির বার্তা। তাঁর ছবির চিত্রনাট্যর বাঁধুনি আর রহস্য উন্মোচন এতখানি জোরদার যে ছবির শেষ না দেখে ওঠা যায় না। তেমনই প্রতিটি চরিত্রের দুরন্ত অভিনয়। সমাজকে এমন এক বার্তা দেয় ‘ওসিডি’ ছবি যা খুব প্রয়োজন ছিল।
এ বছর ২০২৬ সালে জয়ার প্রথম কলকাতার ছবি এটি। জয়া যেন চমকে দিলেন। তিনিই এ ছবির লাগাম নিয়ন্ত্রণ করেছেন। নানা স্তর রয়েছে এই শ্বেতা চরিত্রে। জয়া মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তি দ্বারা এই নারী চরিত্রের নানা স্তর দুর্দান্ত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কখনও মনে হবে তিনি ধূসর চরিত্রে, কখনও তিনিই অসুর দমনে দুর্গা। আসলে জয়া আদতেই কী ইতিবাচক চরিত্রে?
ছোট থেকেই তাঁর ভিতর দুষ্টের দমন করার স্পৃহা। জয়ার ছোটবেলার চরিত্রে আর্শিয়া মুখোপাধ্যায়। সেই এক সময়ের জনপ্রিয় ধারাবাহিকের ‘ভূতু’। আর্শিয়া আর জয়ার মেলবন্ধন ছবিতে খুব সুন্দর রূপে ফুটে উঠেছে। এক যুগ পর আর্শিয়ার দারুণ কামব্যাক। জয়ার কিশোরীবেলাতে সার্থক আর্শিয়া। মায়ের ক্যানসারে মৃত্যু, বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, সৎ ভাই, ঠাকুমার থেকে বিচ্ছিন্নতা একটি কিশোরীকে কী ভাবে সারা জীবন শূন্য করে দেয়, সেই প্রতিবিম্বে আর্শিয়া আর জয়া যেন একে অপরের পরিপূরক। জয়া আহসান তাঁর অভিনয় জীবনে ‘ওসিডি’ দিয়ে নতুন পালক যোগ করলেন।
এছাড়াও অভিনয়ে ঠাকুমার চরিত্রে অনবদ্য অনসূয়া মজুমদার। ঠাকুমার সব পরিস্কার করার বাতিক চলে আসে নাতনির ভিতর ওসিডি হয়ে! বিকৃতকামী পশুর পাপ শরীর মন থেকে ধুয়ে যেতে হয় এই মেয়েটিকে। সে তো একা নয়! নরকের দরজার সামনে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিটি কিশোর কিশোরী। সবাই ‘ভাল কাকু’দের ভাল করার শিকার।
কৌশিক সেন আবারও চমকে দিয়েছেন। ভিলেন তিনি আগেও করেছেন কিন্তু এমন সাহসী চরিত্রে এই প্রথম। এমন চরিত্র যে কোনও অভিনেতার কাছেই চ্যালেঞ্জ। আরেক অভিনেত্রীর কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য শ্রেয়া ভট্টাচার্য। অনবদ্য।
কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাল কাকিমা রূপে তুখোড়। ভাল কাকুর চরিত্রে ফজলুর রহমানকে দেখে গা শিউরেই ওঠে। অ্যাডভোকেটের ভূমিকায় কার্তিকেয় ত্রিপাঠি দারুণ সাবলীল।
মেঘ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবহ সংগীতের সাউন্ডস্কেপ ছবির সম্পদ। তেমনই চিত্রনাট্যকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে অলোক মাইতির সিনেমাটোগ্রাফি।
শ্বেতাকে ঠাম্মা বলেছিল গাছেরও মন খারাপ হয়। আর গাছের হাসি হল তার ফুল। ফুল ফুটল মানে গাছ হাসছে। তেমনই ছবির শেষ মনে করায় অপর্ণা সেনের ‘পরমা’ ছবির শেষ সংলাপ
‘মনে পড়ে গেছে, এতদিন পর! ক্যালেন্ডুলা কেন হবে ও তো শ্যামকাঞ্চন!’
‘ওসিডি‘ ছবি শতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে স্মরণ করেই। তাই ছবির শেষে থাকে সুকান্তর ‘ছাড়পত্র’ বার্তা
‘চ’লে যেতে হবে আমাদের।
চ’লে যাবে—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবাে জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবাে আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
