Adamya Review (2026)| পলাশ ফুটল ‘অদম্য’ বসন্তে, ছয়টি দেশলাই কাঠি প্রতিবাদের আগুন জ্বালল পর্দায়

পেজ 3 বিনোদন

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি: ‘অদম্য’
নিবেদন: অপর্ণা সেন
পরিচালনা: রঞ্জন ঘোষ
প্রধান ভূমিকায়: আরিয়ুন ঘোষ

নিউজপোল বাংলা রেটিং: ৯/১০

বর্তমানে একটি বাংলা ছবি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ জুড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ হৈচৈ পড়ে গিয়েছে। ছবির নাম ‘অদম্য’। আবার এই ছবিতে জড়িয়ে আছে জীবন্ত কিংবদন্তি অপর্ণা সেনের নাম। অপর্ণা সেন গুণগত মানের সৃষ্টি হলেই তবেই তাঁর নাম যুক্ত করেন। তাই ‘অদম্য’ ছবিটি দেখার উৎসাহ ছিলই। পরিচালনায় রঞ্জন ঘোষ। রঞ্জনের ছবির সফর প্রায় শুরু থেকেই আমার দেখা। শ্রীমতী অপর্ণা সেনের কাছেই রঞ্জনের পরিচালনায় হাতেখড়ি। অপর্ণার ‘ইতি মৃণালিনী’ ছবির সহকারী পরিচালক ছিলেন রঞ্জন। এরপর রঞ্জন ঘোষ একক পরিচালনায় ‘হৃদ মাঝারে’, ‘রঙ বেরঙের কড়ি’,’আহা রে’, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ ছবি বানিয়েছেন। কিন্তু ‘অদম্য’ করতে গিয়ে রঞ্জন নিজেকে ভেঙে আবার তৈরি করেছেন। আমার মতে ‘অদম্য’ রঞ্জন ঘোষের পরিচালনায় সেরা ছবি।

Aparna Sen

অথচ এই ছবি দর্শকের কাছে পৌঁছচ্ছে না। শহরের দুটি মাত্র হলে ছবিটি যে কজন দর্শক দেখছেন তাদেরকেই মুগ্ধ করছে। ছবি দেখে চোখের জল বাঁধ মানছে না। আবেগ নয়, মেলোড্রামা নয়, যা হয়েই থাকে বাংলা ছবিতে। এ ছবি প্রতিবাদের ছবি। আমরা যে রাজনৈতিক প্রতিবাদ চাই অথচ তা করে দেখাতে পারি না। নাই বা মিলতে পারে ছবির বার্তার সঙ্গে সব দর্শকের মতামত, তবু এমন প্রতিবাদের ছবি এ সমাজে দরকার। সামাজিক মাধ্যমে আমরা লিখি প্রতিবাদের ভাষা কিন্তু বাস্তবে পারি না। অদম্যর নায়ক পলাশ (আরিউন ঘোষ) যে সমাজের চোখে খলনায়ক, সে দর্শকের চোখে হয়ে উঠল নায়ক। যাকে সত্যি হার মানানো যায় না।

অপর্ণা সেন এই প্রথম নতুন ভূমিকায় আবিভূর্তা হলেন। তিনি এবার রঞ্জন ঘোষ পরিচালিত ‘অদম্য’ ছবির নিবেদক। ছকভাঙা ছবি বানিয়েছেন রঞ্জন ঘোষ।

বাংলা ছবিতে এমন কাজ বিরল। এমন রাজনৈতিক ছবি বিরল। আজ ‘অদম্য’ দেখে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। চমকে দিলেন পরিচালক রঞ্জন ঘোষ, ছবির প্রধান অভিনেতা প্রায় একক অভিনয়ে আরিয়ুন ঘোষ এবং অর্কপ্রভ দাসের দুরন্ত সিনেমাটোগ্রাফি। এই তিনটি উপাদান ‘অদম্য’ ছবির আসল ম্যাজিক।

আরিয়ুনকে দেখে মনে হল মৃণাল সেনের ‘কলকাতা ৭১’ এর দেবরাজ রায়। আরিয়ুন কী পরিমান পরিশ্রম করেছেন যে তাঁর ঘামে, রক্তে মিশে গিয়েছে সাধনার আগুন। এই সময়ের দর্শক এ ধরণের বাংলা ছবিতে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু এমন ছবিতেই শিক্ষিত হওয়া উচিত, অভ্যস্ত হওয়া উচিত। আরিয়ুন যেন সত্যি ছবি জুড়ে ‘একটা দেশলাই কাঠি’। ছবিতে সুকান্তের লেখা ‘একটা দেশলাই কাঠি’ আরিয়ুন নিজের কণ্ঠে দুরন্ত গেয়েছেন। পলাশের মায়ের ছোট্ট চরিত্রে মায়া মমতায় ভরা সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের শতবর্ষে এটি দ্বিতীয় বাংলা ছবি দেখলাম যা সুকান্তকে নতুন ভাবে এ যুগের বাঙালির কাছে পৌঁছে দেবে। প্রথমটি দেখলাম সৌকর্য ঘোষালের ‘ওসিডি’। তবে রঞ্জন ঘোষ মাত্র ছজন তরুণকে দিয়ে পর্দায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন।

এত কম বয়সী চিত্রগ্রাহক অর্কপ্রভ দাসের কিছু শট যেন অবিশ্বাস্য। সুন্দরবন যেভাবে এই ছবিতে উঠে এসছে তা মন্ত্রমুগ্ধ করে! গল্পের বাঁকে বাঁকে যে রোমাঞ্চ তৈরি হয় তার সঙ্গে ধারালো সঙ্গত তৈরি করে অভিজিৎ কুণ্ডুর আবহ।

আসছে 'অদম্য' ! পরিচালক রঞ্জনের সঙ্গে জুটি অপর্ণা সেনের

টলিউড পেল এক নতুন বলিষ্ঠ অভিনেতা আরিয়ুন ঘোষ। যাকে ঘষেমেজে নবকলেবরে গড়েছেন রঞ্জন। একেবারে ন্যূনতম উপাদানে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প বলে ‘অদম্য’। তেমনই চরিত্র পলাশ আরিয়ুন।

অপর্ণা সেন হিরে চিনে নিতে ভুল করেননি। কেন ‘অদম্য’ ছবির নিবেদক অপর্ণা সেন, তার উত্তর পাবেন এই ছবি দেখলেই। কিন্তু ‘অদম্য’ নিয়ে সে অর্থে মেনস্ট্রিমে প্রচার কোথায়? করা যায়নি ছবির প্রিমিয়ার, হয়নি সে অর্থে প্রমোশন। দর্শকের মুখে মুখে ছবির প্রচার চলছে। কিন্তু কজন দর্শক আজকাল বাংলা ছবি দেখেন? যাও দেখেন সে ছবি তারকার ছবি হলেই দেখেন। নিজেদের চিন্তনের পরিবর্তন ঘটাতে এই ছবি দেখা উচিত। তবে ‘অদম্য’ দেখতে লাগবে ধৈর্য্য! একবার এই ছবির ছন্দ ধরে ফেলতে পারলে শেষ না হওয়া অবধি উঠতে পারবেন না।

অপর্ণা সেন নিবেদিত রঞ্জন ঘোষের নতুন ছবি 'অদম্য' - Dainik Statesman

অদম্য’ প্রতিবাদের ছবি বোধদয় ঘটাবে।
ছবিটি বেশি সিনেমাহলে নেই। সুযোগ আছে দেখার এখন দেখুন সবাই।

শেষে একটাই কথা বলার, ‘অদম্য’ হিরো পলাশকে পরের ছবিতে রঞ্জন ঘোষের বাইরে কোনও পরিচালক কি ভাববেন? পলাশের প্রতিভার ধার যেন না কমে ইন্ডাস্ট্রির অপচয় অভ্যাসে।