শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
‘ফণিবাবু ভাইরাল’ (Phonibabu Viral) Film Review
পরিচালনা – রাজু মজুমদার
অভিনয়ে : শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, রোশনি, খরাজ, কাঞ্চন প্রমুখ
বর্তমানে টালিগঞ্জ পাড়ার অবস্থা সংকটজনক। বাংলা ছবি সিনেমাহলে রিলিজ করা নিয়ে চলছে বিস্তর সমস্যা। প্রেক্ষাগৃহে বাংলা ছবির খরা। সবসময়ই উৎসব আবহকে বেছে নেওয়া হয় এক ঝাঁক বাংলা ছবি মুক্তির জন্য। বাকি সময় ছবির সংখ্যা হাতে গোনা। প্রচারও নেই সেসব ছবির। এমন এক অস্থির সময়ে রিলিজ করেছে ‘ফণীবাবু ভাইরাল’ বাংলা ছবি। পরিচালক একেবারেই নবাগত। তবে তিনি কমেডি অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়। তিনি রাজু মজুমদার। পার্শ্বচরিত্রে রাজু মজুমদারকে আমরা বিগত দশক ধরে দেখে এসেছি। এমন একজন অভিনেতার পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ খুবই প্রশংসনীয়। রাজুর প্রথম পরিচালনায় কেমন হল ‘ফণিবাবু ভাইরাল’ (Phonibabu Viral)?

বৃদ্ধ ফণিবাবু বিপত্নীক, কিন্তু তাঁর জীবন থেকে রং হারিয়ে যায়নি। মাঝেমাঝেই তাঁর মরমর অবস্থা হয় , তখন পুত্রকন্যা থেকে প্রতিবেশীরা অবধি শশ্মান যাওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু তবু বুড়ো মরে না। ছেলেমেয়ে বৌমাদের একটাই লক্ষ্য বাবার সম্পত্তির অংশীদার হওয়া। এমনকি ফনিবাবু বেঁচে থাকাকালীন তাঁর মৃত্যুকামনায় মহাসমারোহে শ্রাদ্ধ করে সন্তানরা। কিন্তু জীবনের রং না হারানো ফণিবাবু নিজের শ্রাদ্ধের খিচুড়ি নিজেই খান। আদৌ কি হয় ফণিবাবুর? কী ভাবে তিনি ভাইরাল হয়ে যান নেটদুনিয়ায় সেই নিয়েই মজার গল্প। কিন্তু মজার ভিতর দিয়েই জীবনের সারসত্যটি দেখিয়ে দিয়েছেন পরিচালক।
এই ছবির মূল কাণ্ডারী শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। তিনি ছবিটিকে টেনে নিয়ে গিয়েছেন আর সঙ্গে আছে সুন্দর গল্প। চিত্রনাট্য দুর্বল কোথাও আবার কোথাও বাকি অভিনেতাদের কমেডি অভিনয় অতি চড়া কিন্তু সব দুর্বলতা ঢেকে দিল ফণি শুভাশিসের দুরন্ত অভিনয়। শুভাশিস নিজে নয়ের দশকের বহু মেনস্ট্রিম ছবিতে অতিঅভিনয় এককালে বহু করেছেন। সে হয়তো তখনকার ফিল্ম পরিচালকদের কারণে। তবে বহু বছর পর মেনস্ট্রিমে এত সহজাত অভিনয় করতে দেখা গেল শুভাশিসকে। তিনি বহু মননশীল ছবিতে সিরিয়াস অভিনয় করেছেন। কমেডিয়ান তকমা পাওয়া ইন্ডাস্ট্রিতে ভাল ছবি পাওয়াই দুর্লভ। তার মধ্যে থেকেও ‘শিল্পান্তর’, ‘মহালয়া’, ‘হার্বাট’-এর মতো ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়েছেন তিনি। তবে এবার একেবারেই হার্ডকোর কমেডি ছবিতে ফণিবাবু হয়ে দুর্দান্ত অভিনয় করলেন। ফণিবাবু এমন এক চরিত্র যিনি সম্পত্তি, সম্পর্কের উর্ধে গিয়ে নিজের প্যাশনকে বেছে নিয়েছিলেন। ছেলেমেয়েরা তাঁর গুণ পায়নি। কেবলমাত্র নাতির মধ্যে সেই শিল্পীমন খুঁজে পান ফণি। কাঞ্চন, খরাজ দুজনেই যথাযথ চমৎকার। শুভাশিসের বিপরীতে রোশনি ভট্টাচার্য বেশ সুন্দর অভিনয় করেছেন। স্ত্রী বহু আগেই প্রয়াত তাই ছবিতে দেখা মিলল বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যার। স্ত্রীর আত্মা আজও ফণিবাবুর ঘরে বাঁধা। রোশনি ও শুভাশিস, দুজনের রসায়ন জমে ক্ষীর।
ছবিতে বাদ বাকি নারীচরিত্রদের অভিনয় বেশ দুর্বল ও চড়া দাগের। তবু পারিবারিক গল্পের গুণে মন ভরাল দর্শকদের।

এই ছবির গান বেশ চমকপ্রদ। টাইটেল গানে সমিধ মুখার্জি দারুণ সঙ্গে চমকে দিল বৃদ্ধ শুভাশিস ফণিবাবুর বোলচাল। বেশ লেগেছে ঋতম সেনের লেখা ‘তুমি হলে নদী, আমি তোমার বুকের সাঁকো’ রূপঙ্কর-উরভির ডুয়েট ও শুভাশিস-রোশনির রোম্যান্স। সমিধের মিউজিক মনকাড়া।
ছবির ক্যামেরা থেকে সম্পাদনা যথাযথ। তবে এই ছবির গান একেবারেই ভাইরাল হল না। গানগুলির উপস্থাপন এত সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও সেভাবে প্রচার পাচ্ছে না। স্বর্ণযুগের ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আশিতে আসিও না’ ছবির রেশ পেতে, নিখাদ কৌতুক পেতে এবং জীবনটা একলার কেউ কারুর নয়, বোধ জাগিয়ে তুলতে এই ছবি দেখুন। প্রথম পরিচালক রাজু মজুমদারের ছবি আপনার মন ভরাবে।
