নিউজ পোল ব্যুরো:প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেশেলসের জাতীয় সংসদে ভাষণ দিয়ে নতুন কূটনৈতিক ইতিহাস গড়লেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী(Narendra Modi)। সেশেলসের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে দেওয়া তাঁর ভাষণে উঠে এল ভারত-সেশেলসের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলবায়ু ন্যায়বিচার, নীল অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের কৌশলগত অংশীদারিত্বের রূপরেখা।
ভাষণের শুরুতেই সেশেলসের জনগণকে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেশেলসের জাতীয় সংসদে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পাওয়া তাঁর কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে সেশেলস সরকারের দেওয়া ‘নীল দিগন্তের অভিভাবক’ সম্মানের জন্য রাষ্ট্রপতি ও সে দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা মানুষের জন্য এই সম্মান অনুপ্রেরণার উৎস বলেও উল্লেখ করেন।
মোদী স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সেশেলসই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য। এক দশকে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি সেশেলসের জাতীয় সংসদের প্রথম মহিলা অধ্যক্ষ আজারেল এরনেস্তাকে অভিনন্দন জানান।
ভারত-সেশেলস সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) বলেন, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বয়স ৫০ বছর হলেও দুই দেশের আত্মিক সম্পর্কের ইতিহাস আরও বহু পুরনো। ১৭৭০ সালে ‘টেলিম্যাক’ জাহাজে সেন্ট অ্যান দ্বীপে পৌঁছানো প্রথম অভিযাত্রী দলের মধ্যে পাঁচজন ভারতীয় ছিলেন। সেই সময় থেকেই দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে সম্পর্কের সূচনা, তা আজও অটুট রয়েছে।
নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:https://youtube.com/@thenewspoleতিনি বলেন, ভারত মহাসাগর দুই দেশকে আলাদা করেনি, বরং আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। এই বন্ধুত্ব কোনও সরকারের তৈরি নয়, বরং সাধারণ মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সেশেলসের সংসদের মূলমন্ত্র ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-এর প্রশংসা করে মোদী বলেন, ক্রেওল সংস্কৃতিতে বিশ্বের নানা ঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। সেখানকার সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও উৎসবের মধ্যেও ভারতীয় ঐতিহ্যের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। দীপাবলি, থাই পঙ্গল, নবরাত্রির মতো উৎসব যেমন উদযাপিত হয়, তেমনি কারি, সমোসা ও চাটনিও সেখানকার জনপ্রিয় খাদ্য।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সেশেলসের স্বাধীনতার প্রথম দিনেই পোর্ট ভিক্টোরিয়ায় উপস্থিত ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ আইএনএস নীলগিরি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও সেখানে নোঙর করে রয়েছে আইএনএস তড়কাষ ও আইএনএস ইক্ষক। ভবিষ্যতেও সেশেলসের প্রতিরক্ষা ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভারত পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
তিনি বলেন, ভারত ‘মহাসাগর’ (MAHASAGAR) নীতিতে বিশ্বাসী, যার লক্ষ্য ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সেশেলসকে শুধুমাত্র ‘ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখার ধারণার বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশাল সামুদ্রিক জলসীমার অধিকারী সেশেলস প্রকৃত অর্থেই একটি ‘বৃহৎ মহাসাগরীয় রাষ্ট্র’।
নীল অর্থনীতি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদ, নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সম্প্রতি রোপণ করা বিরল ‘কোকো দে মের’ গাছের প্রসঙ্গ টেনে মোদী বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ভারতীয় দর্শন এবং সেশেলসের পরিবেশচেতনা একই আদর্শে বিশ্বাসী।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ দূষণের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশ ও দ্বীপ রাষ্ট্রগুলিই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে। তাই জলবায়ু মোকাবিলায় ন্যায়বিচার, দায়বদ্ধতা ও সততার ভিত্তিতে বৈশ্বিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক সৌর জোট, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন (LiFE) অভিযান এবং ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ কর্মসূচির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে জি-২০-র প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করতেই ভারতের সভাপতিত্বে আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি-২০-র স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সময়োপযোগী করে তোলাই ভারত ও সেশেলসের অভিন্ন লক্ষ্য।
শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনে সেশেলসের তরুণ প্রজন্ম, পেশাজীবী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ভারত-সেশেলসের এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।
