Dighra Raksha Kali Puja:১৯৭৮ সালের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করে ২১তম বর্ষে দীঘড়া গ্রামের রক্ষা কালীপুজো!

রাজনীতি রাজ্য

নিউজ পোল ব্যুরো:হুগলি জেলার গোঘাটের বালি পঞ্চায়েতের অন্তর্গত দীঘড়া গ্রাম। বছরের একটি বিশেষ সময় এলেই এই শান্ত গ্রাম যেন পরিণত হয় ভক্তি, বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর সামাজিক সম্প্রীতির এক মহামিলনক্ষেত্রে। শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় রীতিনীতি, গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি এবং সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ বছর ধারাবাহিক আয়োজনে ২১তম বর্ষে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী রক্ষা কালীপুজো (Dighra Raksha Kali Puja)।

আরও পড়ুন:বাংলার মা-বোনেদের জন্য ১ জুলাই ধামাকা উপহার! অন্নপূর্ণা যোজনায় আজই টাকা পাচ্ছেন ১.২ কোটি মহিলা, তালিকায় ৫ লক্ষ আদিবাসীও, বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

তবে এই পুজোর ইতিহাস শুধুমাত্র ২১ বছরের নয়। স্থানীয় প্রবীণদের কথায়, ১৯৭৮, ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালেও দীঘড়া গ্রামে রক্ষা কালী মাতার আরাধনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় সেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়। পরে গ্রামবাসীদের ঐকান্তিক উদ্যোগ, ভক্তদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং ঐতিহ্যকে পুনর্জীবিত করার অঙ্গীকারে আবারও শুরু হয় রক্ষা কালীপুজো। সেই পুনরারম্ভের ধারাবাহিকতাতেই এ বছর সফলভাবে পালিত হলো ২১তম বর্ষের এই মহোৎসব।

পুজোকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন ধরেই উৎসবের আবহে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম। নবীনদের উদ্যম আর প্রবীণদের অভিজ্ঞতার মেলবন্ধনে প্রতিটি আয়োজন হয়ে ওঠে আরও সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত। পুজোর সূচনালগ্ন থেকেই শতাব্দীপ্রাচীন রীতিনীতি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন উদ্যোক্তারা।

শুক্রবার (২৬ তারিখ) গভীর রাতে শেওড়াফুলি গঙ্গার ঘাট থেকে পবিত্র গঙ্গাজল সংগ্রহ করতে যান বহু ভক্ত ও গ্রামবাসী। পরদিন শনিবার (২৭ তারিখ) সেই গঙ্গাজল দিয়ে মন্দিরের শুদ্ধিকরণ সম্পন্ন হয়। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে শুরু হয় রক্ষা কালীপুজোর মূল আনুষ্ঠানিকতা।

এরপর বিকেলে ঢাক, কাঁসর, শঙ্খ ও ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের তালে চাঁদাভুক্ত পরিবারের প্রতিটি বাড়িতে যাওয়ার বহু প্রাচীন প্রথা পালন করা হয়। একই সময়ে গ্রামের এক বিশিষ্ট ব্যক্তির বাড়িতে নির্মিত রক্ষা কালীমূর্তিকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে মন্দিরে আনা হয়। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের গর্জন আর ‘জয় মা কালী’ ধ্বনিতে মুখরিত সেই শোভাযাত্রা দেখতে রাস্তার দু’ধারে ভিড় জমান হাজারো মানুষ। ভক্তি আর আবেগে এক অনন্য পরিবেশের সৃষ্টি হয় গোটা এলাকাজুড়ে।

নিউজ পোল বাংলা ইউটিউব লিঙ্ক:https://youtube.com/@thenewspole

শনিবার রাতে বৈদিক নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হয় রক্ষা কালীপুজো। গভীর রাত পর্যন্ত চলে পূজার্চনা ও ধর্মীয় আচার। পরদিন ভোরে প্রথা অনুসারে পাঁঠা বলির আয়োজন করা হয় এবং রাতে ধর্মীয় রীতি মেনে প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হয়। নিরঞ্জনকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ, শঙ্খধ্বনি ও ‘জয় মা কালী’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক।

সোমবার (২৯ তারিখ) সকালে পার্শ্ববর্তী দারকেশ্বর নদী থেকে পবিত্র জল এনে ঐতিহ্যবাহী আটচালার শুদ্ধিকরণ করা হয়। এরপর দীঘড়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজারো মানুষের জন্য আয়োজন করা হয় মহা অন্নভোগের। সকাল থেকেই ভোগ গ্রহণের জন্য ভক্তদের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং শুভানুধ্যায়ীদের আর্থিক ও সার্বিক সহযোগিতায় সফলভাবে সম্পন্ন হয় এই মহাভোগ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ উৎসবকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

আয়োজকদের বক্তব্য, সম্প্রতি গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী আটচালাটি। সেই আনন্দঘন মুহূর্তকে স্মরণীয় করে তুলতেই এ বছর প্রথমবারের মতো বিশেষ মহাভোগের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী বছরগুলোতেও এই প্রথা অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

সোমবার রাত থেকেই শুরু হয়েছে চব্বিশ প্রহরব্যাপী হরিনাম সংকীর্তন। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে এই নামযজ্ঞ। ওইদিন রাধা-গোবিন্দের উদ্দেশ্যে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হবে। সন্ধ্যায় দীঘড়া হরিবাসর প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ ভক্তিমূলক কীর্তনানুষ্ঠান। বিশিষ্ট কীর্তনশিল্পী সুপ্রিয়া হালদার তাঁর সুমধুর কণ্ঠে হরিনাম সংকীর্তন পরিবেশন করবেন। ইতিমধ্যেই এই অনুষ্ঠান ঘিরে ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।

রক্ষা কালীপুজো, রাধা-গোবিন্দের বিশেষ ভোগ নিবেদন এবং চব্বিশ প্রহরব্যাপী হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়েই শেষ হবে এবারের ধর্মীয় মহোৎসব।

আজ দীঘড়া গ্রামের রক্ষা কালীপুজো (Dighra Raksha Kali Puja) শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়—এটি গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ঐক্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসব গ্রামের মানুষকে যেমন একসূত্রে বেঁধে রাখে, তেমনই নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ভক্তির আবেগ, মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং ঐতিহ্য রক্ষার অঙ্গীকারেই দীঘড়া গ্রামের রক্ষা কালীপুজো প্রতি বছর আরও সমৃদ্ধ, আরও গৌরবময় হয়ে উঠছে।