নিউজ পোল ব্যুরো: রাজেশ খান্নার (Rajesh Khanna)জীবনে সাকসেস এসেছিল ধুমকেতুর মত। আবার চলেও গিয়েছিল। মাঝে রেখে গিয়েছিল কিছু ম্যানারিজম আর গানের উপস্থাপনা। রাজেশ খান্নার জীবন নিয়ে আলোচনার কারণ আর কিছুই নয়। এক প্রথম ভারতীয় সুপারস্টারের জীবনে উত্থান-পতনের যে কাহিনী আমাদের চোখের সামনে আসে সেটা সিনেমার স্ক্রিপ্টের চাইতে কিছু কম সাসপেন্স না। আর আমাদের সেই নাটকীয় ওঠাপড়া থেকে শেখার আছে অনেক কিছু।
প্রথম দৃশ্য- ১৯৭১ সালের ব্যাঙ্গালর স্টেডিয়াম। উপলক্ষ্য একটা লটারি টিকিটের বিজেতার নাম ঘোষণা। এসেছেন রাজেশ খান্না। শুধু তাঁকে একবার দেখার জন্য সেদিন স্টেডিয়ামে ছিল উপচে ভরা ভিড়।
দ্বিতীয় দৃশ্য – সালটা ১৯৯০। দিল্লির এক রাজপথে গাড়িতে সিগন্যালের জন্য অপেক্ষা করছেন রাজেশ খান্না। পাশেই একটা গাড়িতে এক কিশোরী বসেছিল। রাজেশ খান্না সেই মেয়েটির দিকে হাসি মুখে তাকালেন। মেয়েটির মুখে এতটুকু ভাবান্তর হল না। রাজেশ খান্না সেদিন ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলেন। একদিন তাঁর গাড়িতে পর্যন্ত মেয়েরা চুমু খেত, এতটা উন্মাদনা ছিল মেয়েদের কাছে। ক্রেজ এতটাই ছিল যে সাদা গাড়ি লাল ছোপে ভরে যেত। আর সেদিন সামনের মেয়েটা তাঁকে চিনতে পর্যন্ত চাইল না!
ভারতের প্রথম সুপারস্টার(super star)রাজেশ খান্নার(Rajesh Khanna) নাম ছিল প্রথমে যতিন খান্না। যতিন থেকে রাজেশ হতে তাঁর সময় লেগেছিল অনেকগুলো বছর। ১৯৪২ সালের ২৯ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে রাজেশ খান্নার জন্ম। যদিও তাঁদের বাড়ি ছিল লাহোরের একান্নবর্তী পরিবার। পরে দেশভাগ হতেই পরিবার মুম্বাই চলে আসেন। বাবা নন্দলাল খান্না ও মা চন্দ্রানীর দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন রাজেশ খান্না। কিন্তু নন্দলালের ভাই চুনিলালের কোন সন্তান না থাকায় যতিনকে দিয়ে দেন। চুনিলালের স্ত্রী লীলাবতী যতিনকে প্রায় রাজার মতই লালন পালন করেন। স্কুল থেকে কলেজ। যতিনের ছোটবেলা থেকেই ছিল অভিনয়ের নেশা। কিন্তু বাবা চুনিলাল যুবক যতিনকে সাফ জানিয়ে দিলেন। তোমার হাতে পাঁচবছর সময় আছে। হয় কিছু করে দেখাও, নাহলে বাড়ির ব্যবসায় নেমে পড়। ঠিক সে সময় মুম্বাইতে এক ট্যালেন্ট সার্চ অনুষ্ঠান হচ্ছিল ফিল্ম ফেয়ার আর সেরা পরিচালকের উদ্যোগে। সেখানে বিনোদ মেহরাকে মাত্র এক ভোটে হারিয়ে খেতাব জিতে নেন যতিন খান্না। এদিকে মামার বাড়িতে মানুষ হচ্ছিল রবি কাপুর। একই সময়ে হিরো দৌড়ে রবি কাপুরও ছিলেন। তিনি সিনেমায় নামার সময় নাম নিলেন জিতেন্দ্র। আর যতিন নাম নিলেন রাজেশ অর্থাৎ রাজার রাজা। ১৯৬৩ সালের সেই কম্পিটিশনের পরে ব্রেক পাওয়াটা ছিল রাজেশ খান্নার সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু রাজেশের পরপর তিনটি ছবিতে ফ্লপ অভিনয় করে মাঠের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম প্রায় স্থির। সেই সময় শাম্মি কাপুরের ছেড়ে যাওয়া রোলে আরাধনাতে এল অভিনয়ের সুযোগ। আরাধনার কাহিনিও ছিল নারীপ্রধান। আর রাজেশের ছিল ছোট্ট একটা রোল। পরে রাজেশের ছেলের রোলও রাজেশকে দিয়েই করা হয়। শুরু হল রোমান্টিক অধ্যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের প্রথম সুপারস্টারের (super star)উত্থানের পরে একটা কথা খুব চলত। উপরে আকা(ভগবান) আর নিচে রাকা।
আর এই অহংকারই ডেকে এনেছিল রাজেশ খান্নার জীবনে অনেক বিড়ম্বনা। ছিল অঞ্জু মহেন্দ্রর সঙ্গে দীর্ঘ বছরের প্রেম। করত গঠনমূলক সমালোচনা। অথচ সেটাই এক সময় রাজেশ খান্নার ভাল লাগত না। হাজার হাজার মেয়ের মত অঞ্জু চাপ্লুশি করত না বলে ক্রমশ দুরত্ব বাড়ছিল। একদিকে অঞ্জুর নিজস্ব ক্যারিয়ার ও সচেতন চিন্তা ভাবনা। অন্যদিকে সিনেমা করতে করতে প্রেমে পড়লেন ডিম্পলের। ঝড়ের গতিতে এক দুর্নিবার প্রেমে পরে জুহু বিচে ঘুরতে ঘুরতে ঋষি কাপুরের দেওয়া এনগেজমেনটের আংটি সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ডিম্পলকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন রাজেশ খান্না।(Rajesh Khanna) মাত্র ১৬ বছরের ডিম্পলকে বিয়ে করতে যাওয়ার পথে জোর করে শোভাযাত্রা ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন অঞ্জুর বাড়ির দিকে। প্রেম আর ঘৃণা একই কয়েনের দুই পিঠ!
শাম্মি কাপুরের ছেড়ে দেওয়া জামা পরে অভিনয় করে একদিন রাজেশ খান্নার জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। আবার তাঁর ছেড়ে যাওয়া ড্রেস পরে আর এক অভিনেতা একদিন তাঁকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ছবির নাম ছিল জঞ্জির। সেলিম-জাভেদের এই সিনেমার প্রথম অফার এসেছিল রাজেশের কাছে। যে অমিতাভের কাছে সব ক্ষেত্রেই হার স্বীকার করতে হয়েছে বারবার। দাঁড়ান স্যর, মারধর দেওয়ার আগে একটু বলার সুযোগ দিন।
আনন্দ ছবিতে প্রথম মুখোমুখি দুই রথী। ততদিনে রাজেশ খান্না বুঝে ফেলেছেন, যে ছবিতে তিনি মারা যাবেন সেই ছবিই হিট। ফলে যথেচ্ছ চাপ দিয়ে কাহিনীতে হস্তক্ষেপ করতেন রাজেশ খান্না। এখানেও তাই করেছিলেন, কিন্তু রোমান্টিক নায়কের জমানা থেকে দর্শক ক্রমশ অমিতাভের রাগী চরিত্রের দিকে ঝুঁকছিল। ফলে রাজেশের গ্রাফ নামতে শুরু করল। সারা জীবন রাজেশের(রাজার রাজা) মতই কাটিয়ে এইবার কঠিন বাস্তবের সামনে তিনি – রাজেশ খান্না। শুরু হল খারাপ দিন। সেই সময় রাজেশের মনে অঞ্জুর কথা মনে এসেছিল কিনা জানা নেই কিন্তু এতটাই হতাশ হয়েছিলেন যে সেই জুহুর জলে ডুবে মরতে চেয়েছিলেন। কারণ অমিতাভের কাছে সমস্ত ফিল্ডেই হেরেছেন রাজেশ। অভিনয় মঞ্চ থেকে রাজনীতির ক্ষেত্রেও হেরেছেন রাজেশ খান্না। রাজনীতির মঞ্চে একবার সাংসদ হয়েছিলেন। যে রাজীব গান্ধির সাথে বন্ধুত্বের সুবাদে রাজনীতিতে আসা। সেই রাজীব গান্ধির অপমৃত্যুর পরে দলেও কল্কে পেতেন না । রাজেশ খান্নার শেষ হিট ছবি অবতার। সত্যিই অবতারের মত কাটিয়েছেন অবতার রাজেশ খান্না।
