Editorial: শিক্ষাক্ষেত্র বেড়েছে যত, নিয়ন্ত্রণ কমেছে তত।

সম্পাদকীয়

বিগত দশ বছরে এই রাজ্যে কলেজের (education)সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে ; এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কলেজ-রাজনীতি ও ক্যাম্পাসকে ঘিরে সংঘাতের প্রবণতা, যার তীব্র, মর্মান্তিক নিদর্শন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনা । শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে মননের বিপ্লব। সেই বিপ্লবের প্রকাশ আজ সবার আগে যদি যথেচ্ছাচারে পর্যবসিত হয় তবে সেটা যে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবক্ষয়িত রূপকেই প্রতিফলিত করে তাতে কোন ভুল নেই। ভুল টোটাল আউট সোর্সিংকেই চোখের সামনে এনে দাড় করায়।
উচ্চশিক্ষার দ্রুত প্রসার ও বাস্তবতা
নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠাতা, অধিক ভর্তির সুযোগ, এবং সরকারি ও বেসরকারি (স্বতন্ত্র) প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব—এসবই উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছে। উচ্চশিক্ষা এখন অনেক বেশি সহজলভ্য। কিন্তু একইসঙ্গে উঠেছে প্রশ্ন—গুণগত মানের উন্নয়ন কতখানি? পরিকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকের ঘাটতি, নিয়মিত ক্লাসের অনিশ্চয়তা, এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা স্কুল-কলেজের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করেছে ।

আরও পড়ুনঃ https://thenewspole.com/2025/09/12/slug-asian-countries-are-in-chaotic-situation/

ছাত্র রাজনীতির উত্থান ও সংঘাত
কলেজ রাজনীতির ইতিহাস বহু পুরনো হলেও, গত দশকে তা আরও তীব্র হয়েছে। ছাত্র সংগঠনের দলীয় কার্যকলাপ, দলভিত্তিক ‘ক্যাম্পাস দখল’, বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ—এসব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে বিভাজন, ভয়, ও সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজনীতির মাধ্যমেই অনেকে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার লড়াই, ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ঘটান। এখানেই জন্ম নেয় হোস্টেলে র‍্যাগিং, মানসিক অত্যাচার, এবং অপমান-লাঞ্ছনা—যাদবপুরের সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনা স্পষ্টভাবে সেই অস্থিরতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ।

নিরাপত্তা ও প্রশাসনের ব্যর্থতা
কলেজ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন মাঝে মধ্যে নীরব থাকে বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢিলেঢালা, মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন বা কাউন্সেলিং-এর অভাব, এবং বিচারবহির্ভূত কার্যকলাপ—এসব কারণে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও কল্যাণ উপেক্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে, দোষীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা সাংঘাতিক বিবাদের কারণে সুষ্ঠু তদন্ত বিঘ্নিত হয়। অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের প্রত্যাশা, কলেজ কর্তৃপক্ষ যেন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায় ।

আরও পড়ুনঃ https://thenewspole.com/2025/09/12/slug-asian-countries-are-in-chaotic-situation/

পরিবর্তনের প্রত্যাশা
বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য-পরামর্শ, এবং ছাত্র-আচরণবিধি কার্যকর করা জরুরি। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থান আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। শিক্ষা শুধু ডিগ্রি নয়, মানবিক মূল্যবোধ ও নিরাপদ পরিবেশেরও নিশ্চয়তা দিতে হবে। যাদবপুরের ঘটনা সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে—কলেজ-রাজনীতির বর্তমানে আমরা কোথায় যাচ্ছি? শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে?—এই প্রশ্ন আজ আমাদের সবার মানসিক তন্ত্রীতে আঘাত হানছে ।
কলেজ রাজনীতির কারণে শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, যা পাঠদান, প্রশাসন, শিক্ষার্থী পরিবেশ ও মানসিকতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে ।
পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার মান
রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব: রাজনৈতিক আদর্শ ও গোষ্ঠীগুলোর চাপের ফলে পাঠ্যক্রম, ইতিহাস, ভাষা, ও মূল্যবোধে পক্ষপাত দেখা যায়; এটি শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতাকে ক্ষুন্ন করতে পারে ।
পাঠ্যবিষয় নির্বাচন ও পরিবর্তন: কী পড়ানো হবে, তার সিদ্ধান্তে রাজনীতিকদের হস্তক্ষেপ—নতুন বিষয় যুক্ত বা বাদ পড়ার প্রবণতা বাড়ে। ফলে শিক্ষার নান্দনিকতা ও গভীরতায় ভাঁটা পড়ে ।
প্রশাসন ও অবকাঠামো(Administration and infrastructure)
নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাত : শিক্ষক, প্রশাসক, উপাচার্য নিয়োগে দলীয় সমর্থকদের অগ্রাধিকার পাওয়া যায়, ফলে মেধাভিত্তিক নির্বাচন দুর্বল হয়, ও প্রতিষ্ঠানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।
অর্থ ও সুবিধা বণ্টনে বৈষম্য: রাজনীতির কারণে ক্যাম্পাসে সুবিধা-বঞ্চনা, অর্থ বরাদ্দে বৈষম্য, এবং অবকাঠামো (infrastructure)উন্নয়নে অনিয়ম চোখে পড়ে ।
ছাত্র-পরিবেশ ও মানসিকতা
পোলারাইজেশন ও সংঘর্ষ: রাজনীতিভিত্তিক ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসকে বিভক্ত করে, সংঘর্ষ, র‍্যাগিং, ও নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করে; মাঝে মাঝে ছাত্রদের পাঠে ও মানসিক স্বাস্থ্যে বাধা আসে ।
রাজনৈতিক চর্চার সুযোগ Politics & Educaton: ইতিবাচক দিক—ছাত্রদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নেতৃত্বের দক্ষতা, ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে ওঠে; তবে বহিরাগত বা উগ্রপন্থী রাজনীতি অপশাসন, সহিষ্ণুতার অভাব ও শৃঙ্খলার দুর্বলতা প্রকট হয়ে পড়ে।
সার্বিক প্রতিচ্ছবি(scinario)কলেজ রাজনীতির প্রভাবে শিক্ষাব্যবস্থা কোথাও গণতন্ত্র ও নেতৃত্ব চর্চার ক্ষেত্র, আবার কোথাও রাজনৈতিক পক্ষপাত, সংঘর্ষ, ও মান অবনমনের উৎস হয়ে উঠেছে—যার সমন্বয়ে শিক্ষার সঠিক লক্ষ্য ও পরিবেশের ওপর স্থায়ী ছাপ পড়ে ।