পুজো(DurgaPuja)শুরু হয়ে গেছে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে। অথচ সম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে আবাহনের আগেই বিসর্জনের বিষাদের সুর বেজে উঠছে।
প্রথমেই বলতে হয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথা। প্রায় ৫০ বছর পরে এইরকম ভয়াবহ বৃষ্টি বিপর্যয়। শুধু তাই নয়। সঙ্গে গাফিলতির কারণে দেখা দিল মৃত্যু মিছিল। একদিনে বিদ্যুৎ কেড়ে নিয়ে গেল ১১ টি তাজা প্রাণ। কোন ক্ষতিপূরণের অংক কি এই ব্যাথার মলম হতে পারে। একই বৃষ্টিতে কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ার ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। ব্যাপক ক্ষতির মুখে তাদের রুটি রুজির সংস্থান। বাদ যায়নি কাপড় ব্যবসায়িরাও। একই রকম অস্তিত্বের সংকটে তাদের ব্যবসা। আর সব কিছু ছাপিয়ে সামনে এসেছে চতুর্থীর দিন। ঢাকের আওয়াজ ঢেকে কলকাতার বুকে উঠেছে মিছিলের (EmploymentCrisis) আওয়াজ। চাকরিপ্রার্থীরা এদিনও পথে নেমেছেন। বিকাশ ভবনে গেছেন, জানিয়েছেন পুজোর আনন্দের উপরে উঠেছে তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। চুরমার হয়ে যাচ্ছে পাস করার পরেও চাকরি না পেয়ে জীবনের প্রাথমিক চাহিদা মিলছে না । ২০১৬ সালের আন্দোলনের ধারায় এবার তাড়াতাড়িই পথে ২০২২ সালের প্রার্থীরাও। একই দিনে মাদ্রাসা প্রার্থীরাও দাবি মিছিলে পথকেই যেন ঠিকানা করেছেন। যে পথ শুধু দাবি শোনে। কোন উত্তর দেয়না। কেউ ভাল নেই- এই নামে অবসাদের কবিতাই লিখেছেন বেশ কয়েকজন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঠিকই লিখেছিলেন- কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখেনা। ভরসা শুধু এই কথাটা। ভয় যেমন সংক্রামক, সাহসও তাই।
এবারের পূজোর মুখে বাংলার আকাশে ঢাকের আওয়াজ বাজলেও মানুষের মনের ভাঁজে যেন আনন্দের বদলে অশান্তি ও উদ্বেগের দোলাচল । চাকরি প্রার্থীরা বছরের পর বছর পরীক্ষা, নিয়োগের প্রতিশ্রুতি আর আইনি জটের ফাঁদে আটকে থেকে আশা হারাচ্ছে। অন্যদিকে বই ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা – সকলেই বাজারের মন্দা, অনিশ্চয়তা আর ক্রেতার অভাব দেখে দিশেহারা। চাকরির আশায় তরুণ সমাজ বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও চাকরি প্রার্থীরা কেবল প্রতিশ্রুতি শুনছে, নিয়োগের খবর পাচ্ছে না। কোর্টের দরজায় ঘুরে একদিকে আর্থিক দুরবস্থায় ভুগছে, অন্যদিকে মানসিক যন্ত্রণা বাড়ছে। পুজোর আগে এই বেকারত্বের হতাশা যেন বাঙালির উৎসব-আনন্দকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।
প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের (BookSellers)অবস্থা আরও করুণ। পাঠকের সংখ্যা কমে যাওয়া, ডিজিটাল ঝড়, মুদ্রণ খরচের বৃদ্ধি এবং সরকারি উদ্যোগের অভাবে বই বাজার যেন টিকে থাকার লড়াই করছে। পুজোর আগে যখন বিক্রির কথা থাকে, তখনও দোকানির চোখে উদ্বেগের ছায়া। শুধুই বই নয়—পোশাক ব্যবসা থেকে হকার পর্যন্ত খুচরো বাজার জুড়ে একই ছবি। তবে কার জন্য এই উৎসব ? দুর্গাপুজো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, অথচ এ বছর যেন মানুষের কণ্ঠে নেই সেই উচ্ছ্বাস। খুব সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষিত বেকার যুবক—সবাই এক বুক দুঃখে ভরে উঠছে। পথ কোথায়?এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য সরকারের সচেতন উদ্যোগ এবং ভরসার বার্তা জরুরি। স্বচ্ছ নিয়োগ, কর্মসংস্থানের প্রসার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা ও সাংস্কৃতিক পুঁজির সঠিক সদ্ব্যবহার ছাড়া বাংলার অর্থনীতি ও মনোভূমি ফের উজ্জ্বল হতে পারবে না। বাংলার মানুষ উৎসবপ্রিয় —তারা কষ্টের মাঝেও আনন্দ খুঁজে নিতে জানে। কিন্তু একসঙ্গে চাকরিহীন তরুণ, হতাশ ব্যবসায়ী ও দিশাহীন সাধারণ মানুষ—সবার কণ্ঠে যখন একই হাহাকার, তখন পুজোর আলোর ঝলকানিও ম্লান হয়ে যায়। ঢাকের তালে কোমর দোলের জায়গায় ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ… । উৎসবের সঙ্গে উপহারের সার্বিক যোগ। সেখানে ক্রয় ক্ষমতা একটা বড় ফ্যাক্টর। এবার তাই আলোর উৎসবের আগে প্রয়োজন আস্থার মশাল।
