মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে কাশির সিরাপে (Cough Syrup)বিষক্রিয়ায় শিশুমৃত্যু এবং পশ্চিমবঙ্গে ওষুধের ভেজাল একটি গভীর স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে ইতিমধ্যেই ১২ শিশুর মৃত্যু একদিকে যেমন আমাদের ব্যথিত করে তেমনি ভাবিয়ে তোলে নির্লজ্জ মুনাফাবাজির এই ব্যবসায়িক ঝোঁক দেখে। জীবনদায়ী ওষুধে জালিয়াতি ভীষণভাবে একটা উন্মুক্ত দুর্নীতির পক্ষে দৃষ্টি নিয়ে যায়। আমাদের দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলার চরম উদাহরণ।
ভারতের ওষুধ শিল্প বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম হলেও এর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং পর্যাপ্ত পরিদর্শকের অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ছোট ও মাঝারি ওষুধ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলি প্রায়ই গুণমান পরীক্ষা এড়িয়ে যায় এবং নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে। শিশুদের বিশেষ ঝুঁকি দেখা যায়। কারণ শিশুদের শরীরে ওষুধের বিপাক ভিন্নভাবে হয়। ভেজাল বা বিষাক্ত উপাদানযুক্ত ওষুধ তাদের জন্য বিশেষভাবে মারাত্মক।
[আরও পড়ুন] http://গ্রেফতারী নয়, আলোচনাই হতে পারে সমাধানের পথ।
কাশির সিরাপে (cough syrup)ডাইইথাইলিন গ্লাইকল বা মিথানলের মতো বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে, যা শিশুদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির থেকে ভাল নয়। পশ্চিমবঙ্গে ওষুধের ভেজাল সমস্যা নতুন নয়। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নকল ও নিম্নমানের ওষুধের বাজার বিস্তৃত। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে সরবরাহকৃত ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। রাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের অপ্রতুল জনবল এবং দুর্নীতি এই সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। ভেজাল ওষুধের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর আস্থার সংকট তৈরি করে। মানুষ চিকিৎসা নিতে ভয় পায়, যার ফলে রোগ সংক্রমণ বাড়ে এবং সামাজিক স্বাস্থ্য খরচ বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসকরাও ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। এই সমস্যা যেমন দীর্ঘ বছরের, এর শিকড়ও তেমনি গভীরে ছড়িয়ে গেছে। ফলে এই সমস্যা সমাধানের জন্যও খুঁজতে হবে দীর্ঘ কষ্টকর পথের। যাতে দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর প্রভাব পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে সমস্ত ওষুধ উৎপাদনকারী সংস্থার আকস্মিক পরিদর্শন এবং বাজারে প্রচলিত সন্দেহজনক ওষুধ প্রত্যাহার জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে প্রয়োজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পরিদর্শক নিয়োগ এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। ওষুধের ভেজাল কারবারিকে দিতে হবে কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি। প্রথমেই বাতিল করতে হবে সংশ্লিষ্ট ওষুধ উৎপাদক সংস্থার লাইসেন্স । দরকারে সংশোধন করতে হবে সংবিধানের ধারা। অবশ্যই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে। ওষুধের প্রতিটি ব্যাচের জন্য বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে। সরকারকে ওষুধ নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং হুইসেল ব্লোয়ার সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। শিশুমৃত্যুর(cough syrup)এই ভয়াবহ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অবহেলার মূল্য কত ভয়ানক হতে পারে।
