Editorial : যোগীরাজ্যে সাংবাদিক খুনের মিছিল

সম্পাদকীয়

নিউজ পোল ব্যুরোঃ যোগীরাজ্যে আবার সাংবাদিক(Journalist murder) খুন। এবার খুন প্রয়াগরাজে। গত পাঁচবছরে শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই এ নিয়ে খুন হয়ে গেলেন ৫ জন সাংবাদিক এবং গত দশ বছর ধরেই সাংবাদিক হত্যায় শীর্ষস্থানে উত্তর প্রদেশ। প্রয়াগরাজে নিহত সাংবাদিকের নাম লক্ষীনারায়ণ সিং, তিনি বৃহস্পতিবার রাতে খুন হন।
প্রয়াগরাজের সাংবাদিক লক্ষ্মীনারায়ণ সিংয়ের রক্ত ঝরল বৃহস্পতিবার রাতে। এই একটি সংবাদ দেশের গণতান্ত্রিক বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে এটি আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নিত্যঘটনা হয়ে উঠছে। গত পাঁচ বছরে শুধু এই রাজ্যেই খুন হয়েছেন পাঁচজন সাংবাদিক।(Journalist murder) এক দশকে সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি। আধুনিক ভারতের সংবাদমাধ্যম আজ শুধু চাপে নয়—এক ভয়ানক আতঙ্কে বাস করছে ।
লক্ষ্মীনারায়ণ সিং, স্থানীয় মহলে ‘পাপ্পু’ নামে পরিচিত, ছিলেন এক অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও হাই কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতির আত্মীয়। তাঁকে ছুরির কোপে ২০–২৫ বার আঘাত করে খুন করা হয় প্রয়াগরাজের হর্ষ হোটেলের সামনে। পুলিশের তথ্যমতে, প্রধান অভিযুক্ত বিশালকে ‘এনকাউন্টার’-এর পর আহত অবস্থায় ধরা হয়েছে—তার পায়ে তিনবার গুলি লেগেছে। তদন্ত বলছে, খুনের আগেও তাঁদের মধ্যে বিবাদ হয়েছিল ।

[আরও পড়ুন] http://ট্রাম্পের এশিয়া সফরের পিছনে যে সত্য লুকিয়ে
কলম ও কার্তুজের লড়াইকে সামনে এনে এ যেন এক অদ্ভুত যুগের রোজনামচা। যেখানে সাংবাদিকের প্রশ্ন হচ্ছে প্রশাসনের জন্য অপরাধ। বারবার বন্দুকের নল, ছুরি, কিংবা মিথ্যা মামলার আড়ালে লুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে কলমের শক্তিকে। উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগীরাজে অবাধ রাজত্বের দাবি সামনে এগিয়ে আসে । ততবারই বাস্তব তার বিপরীত ছবি আঁকে। গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনার পাশাপাশি , মামলা কিংবা খুনের ঘটনা এক গা শিউরে ওঠার মতো পরিসংখ্যান গড়ে তুলেছে। ২০১৭ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ১২ জন সাংবাদিক খুন, ৪৮ জন আক্রান্ত এবং ৬৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছিল(সরকারি সূত্র অনুসারে প্রাপ্ত তথ্য) । এ এক ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক বার্তা । এরই পাশে চলে আবার ন্যায়বিচারের নামে নাটক। সেই এনকাউন্টার সংস্কৃতি, যেটিকে প্রশাসন আইনের রক্ষকদের দিয়ে আদ্যন্ত বে-আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের রাস্তা খুঁজে নেয়। অসহিষ্ণু মানুষের কাছে আইন আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা যার একটা কারণ। এনকাউণ্টার নামে আদালতকে উপেক্ষা করে নিজেরাই অভিযুক্তকে হাতেনাতে ধরতে গিয়ে মেরে ফেলার নাটক করে। ফলে সাপও মরে, লাঠিও ভাঙ্গে। আমার দেশে এক অদ্ভুত সো কলড ট্রেনড দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। রামরহিমের মত কুখ্যাত অপরাধীকে কথায় কথায় প্যারোলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে একজন পুরস্কার প্রাপ্ত দেশপ্রেমিককে জেলে ভরা হয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে । ফলে ধামাচাপা দেওয়ার এই এনকাউনটার কালচারকে প্রায়শই সত্যকে চাপা দেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয় । অভিযুক্ত আহত বা মৃত, কিন্তু উত্তরপ্রদেশে প্রতিটি নতুন হত্যার পরেও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনও স্পষ্ট নীতি দেখা যায় না। সত্যিই কি এই অনুসন্ধানগুলোর পেছনে কেবল ব্যক্তিগত বিবাদ, নাকি এর ভিতর লুকিয়ে আছে এক তীব্র ভয়। সেই প্রশ্নই মূলত ভয়ের রাজতন্ত্রের মূলে চলে যাচ্ছে । নীরবতার রাজনীতি ফর্মুলায় জনগণের কণ্ঠরোধ করে আসলে সমাজেরই গলা টিপে ধরা হচ্ছে।
সাংবাদিক(Journalist murder) হত্যা মানে কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি সমাজের কণ্ঠরোধ। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে যদি প্রতিবার রক্তে রাঙাতে হয়, তবে রাষ্ট্র নিজেই নিজের প্রমাণপত্র বাতিল করছে। উত্তরপ্রদেশ আজ যেন ভারতের সংবাদ মাধ্যমকে চুপ করিয়ে রাখতে চায়। এই মৃত্যু তাই কেবল লক্ষ্মীনারায়ণ সিং-এর নয়; এটি এক নীতির মৃত্যু—যেখানে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক বিশ্বাসে টিকে থাকার কথা। আর যতদিন না সাংবাদিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে, ততদিন গণতন্ত্রের রাঙা সকালের স্বপ্ন সত্যিই সামনে আসবে না।